রাত জেগে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখে সকালে অফিস—সম্ভব?
বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে ঢাকার অফিস, ক্যাম্পাস আর রাস্তাঘাটে যে প্রভাব পড়তে যাচ্ছে, তা কেবল ক্লান্তির গল্প নয়—এটি বাঙালির ফুটবলপ্রেমেরও এক অনন্য প্রতিচ্ছবি
বড় পর্দায় ফুটবল বিশ্বকাপ ম্যাচ উপভোগ করতে রাজধানী ঢাকার এক ভেন্যুতে সমর্থকদের ভিড়। ছবি: ডয়চে ভেলে
সোমবার রাত ১টায় শুরু হবে বিশ্বকাপ ফাইনাল, আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ফয়সালা না হলে অতিরিক্ত সময়, তাতেও না হলে টাইব্রেকার—সব মিলিয়ে ঘড়ির কাঁটা তখন ভোর ৪টার ঘরে। ট্রফি হাতে ওঠার উল্লাস কিংবা হারের কান্না, যা-ই ঘটুক না কেন, খেলা শেষ হতে হতে পূর্বাকাশে তখন আলো ফোটার অপেক্ষা।
আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে বাস্তবতার এক নির্মম রসিকতা। এই আবেগঘন রাতের মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পরই, সকাল ৯টায় ঢাকার অসংখ্য অফিসে বায়োমেট্রিক মেশিনে আঙুল ছোঁয়াতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে হাজিরা দিতে হবে। ঘুমহীন লাল চোখ, ক্লান্ত শরীর আর মনের মধ্যে জমে থাকা এক ম্যাচের রেশ নিয়েই শুরু হবে সপ্তাহের নতুন কর্মদিবস।
খেলা শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফেসবুকের নিউজফিড বদলে যাবে এক অলিখিত যুদ্ধক্ষেত্রে। বিজয়ী দলের সমর্থকদের টাইমলাইনে তখন একের পর এক মিম, ট্রফি হাতে মেসি কিংবা ইয়ামালের এডিট করা ছবি, আর পরাজিত দলের সমর্থকদের নিয়ে মজার ট্রোলিং। অন্যদিকে হেরে যাওয়া দলের অনেক সমর্থক সাময়িকভাবে আইডি ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেবেন কিংবা কমেন্ট বক্স বন্ধ করে দেন—এই দৃশ্য প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত দেখা যায়।
তবে এর পাশাপাশি থাকে খাঁটি আনন্দের মুহূর্তও। ছাদে ছাদে পতাকা নিয়ে বিজয় মিছিল, পাড়ার মোড়ে মিষ্টি বিতরণ, বন্ধুদের গ্রুপে 'কালকে মিষ্টিমুখ করাতে হবে' জাতীয় আবদার—এসবই বাঙালি ফুটবলপ্রেমের চিরচেনা রূপ। ভোর ৪টায় ঘুম ভাঙা প্রতিবেশীরাও জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন, কোন দল জিতল—আতশবাজির শব্দ শুনেই আন্দাজ করা যায় ফলাফল।
বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের কর্মদিবস নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয় কর্মক্ষেত্রেই। খাত ভেদে এই কর্মক্ষেত্রের সমস্যার ধরনও ভিন্ন।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মঙ্গলবার সকালে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি বাড়ার শঙ্কা থাকে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ দেরিতে অফিসে আসেন, আর যারা আসেন তাদের মধ্যেও কাজের চেয়ে খেলা নিয়ে আড্ডার আমেজ বেশি দেখা যায়। ফাইলপত্র হাতে নিয়ে বসে থাকা সেবাপ্রার্থীদের তখন শুনতে হয়, 'স্যার এখনো আসেননি' কিংবা 'একটু পরে আসেন'।
বেসরকারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে সমস্যাটা আরও সূক্ষ্ম—একে বলা হয় 'প্রেজেন্টিজম'। কর্মী শারীরিকভাবে ডেস্কে উপস্থিত থাকলেও ঘুমহীনতার কারণে তার কর্মক্ষমতা নেমে আসে প্রায় অর্ধেকে। মনোযোগের ঘাটতি, সিদ্ধান্তহীনতা আর তথাকথিত 'ব্রেন ফগ'-এর কারণে হিসাবের ভুল, ইমেইলে ভুল তথ্য পাঠানো কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ভুলে যাওয়ার ঘটনা বেড়ে যায়। কাপে চা ঠান্ডা হয়ে যায়, ফাইল হাতে নিয়ে বসে থাকতে থাকতে চোখ লেগে আসে। আর থাকে 'সাইবারলোফিং'—কাজের ফাঁকে ফাঁকে ব্রাউজারের আরেকটি ট্যাবে লুকিয়ে ম্যাচ হাইলাইটস কিংবা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান দেখার প্রবণতা।
সবচেয়ে বড় চাপটা পড়ে সংবাদমাধ্যমের নিউজডেস্কে। ভোর ৪টায় ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ব্রেকিং নিউজ তৈরি ও আপলোডের প্রতিযোগিতা—প্রতিটি অনলাইন পোর্টাল চায় সবার আগে খবর পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে। রাতভর জেগে থাকা নিউজডেস্কের সাংবাদিক-সম্পাদকদের জন্য এটি চরম ধকলের একটি রাত। আর সকালের শিফটে প্রায়ই দেখা দেয় ব্যাকআপ কর্মী সংকট—কারণ আগের রাতের ক্লান্তি কাটিয়ে সময়মতো অফিসে আসা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
কর্মক্ষেত্রের বাইরে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হলো রাস্তা। সারারাত জেগে খেলা দেখা উবার ও রাইড শেয়ারিং চালকদের চোখে তখন ঘুম জড়ানো, অথচ সকাল থেকেই তাদের রাস্তায় নামতে হয় জীবিকার তাগিদে। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। একই চিত্র ফুডপান্ডা, পাঠাওসহ বিভিন্ন ডেলিভারি অ্যাপের রাইডারদের ক্ষেত্রেও—রাত জাগার ক্লান্তিতে ডেলিভারির গতি কমে যায়, অনেক সময় অর্ডার বাতিলের ঘটনাও ঘটে।
খেলার উত্তেজনা যত তীব্র, তার শেষটাও ততটাই ফাঁকা। প্রায় এক মাস ধরে চলা বিশ্বকাপের উন্মাদনা, প্রতিদিনের আলোচনা, ভবিষ্যদ্বাণী আর দলবেঁধে খেলা দেখার যে সামাজিক আনন্দ—ফাইনালের সঙ্গে সঙ্গেই তার সমাপ্তি ঘটে। মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায় একে বলা যায় এক ধরনের 'পোস্ট-ইভেন্ট ব্লুজ'।
মঙ্গলবার থেকে হঠাৎ করেই জীবনে নেমে আসবে একঘেয়েমি—রাতের আড্ডা নেই, আলোচনার নতুন বিষয় নেই, অপেক্ষার উত্তেজনাও নেই। অনেকের কাছেই এই শূন্যতা সাময়িক মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, যা কর্মক্ষেত্রের সমস্যার সঙ্গে মিলেমিশে সপ্তাহের শুরুটাকে করে তুলবে আরও ভারী।
অগ্রণী ব্যাংকের জাবি ক্যাম্পাস শাখার কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানান, 'অফিসে সকাল ৯টায় ঢুকতে হবে জানি, কিন্তু মেসির হাতে কাপ দেখার এই মুহূর্তটা জীবনে একবারই আসে। কাল প্রয়োজনে দুই কাপ কফি বেশি খেয়ে হলেও ডেস্কে বসে থাকব, তাও এই ফাইনাল মিস করব না।'
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মীর রাসেল বলেন, 'পরীক্ষার রুটিনের মধ্যেই ফাইনাল পড়ে গেছে, তবু বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে দেখব ঠিক করেছি। স্পেন জিতলে সকালে ক্লাসে ঘুম চোখেও একটা বিজয়ীর হাসি নিয়ে যেতে পারব, এটাই বা কম কী!'
বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে ঢাকার অফিস, ক্যাম্পাস আর রাস্তাঘাটে যে প্রভাব পড়তে যাচ্ছে, তা কেবল ক্লান্তির গল্প নয়—এটি বাঙালির ফুটবলপ্রেমেরও এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। পোস্ট-ম্যাচ হ্যাংওভার আর কর্মক্ষেত্রের সমস্যা সামলে হলেও, ভোর ৪টার সেই উন্মাদনাকে বুকে নিয়েই সোমবার রাতে টিভির সামনে বসবেন কোটি কোটি দর্শক— কারণ ফুটবল যে শুধু খেলা নয়, এক জাতির আবেগের নাম।