EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষাই নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৫ এএম

পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষাই নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

রুদাবেহ্ শহীদ

অ অ

বাংলাদেশের নির্বাচিত নতুন সরকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতের মতো বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এমন কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া সেন্টারের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার বিভাগে ভিজিটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর রুদাবেহ্ শহীদ।

বাংলাদেশে গত তিনটি নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো যতটা উচ্চকণ্ঠ ছিল, এবার পরিস্থিতি অন্য রকম। পশ্চিমা দেশগুলোর  অনেকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখার প্রত্যাশার কথা বলছে। কিন্তু অনেকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলছে না। এর কারণ কী?

রুদাবেহ্ শহীদ : এখানে একটা বড় বিষয় হলো—এত বছর ধরে যে সরকার ছিল, তাদের সময়ে কী ধরনের নির্বাচন হয়েছে, সেটা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ভরার দৃশ্য আমরা নিজেরাই বিবিসির প্রতিবেদনে দেখেছি। এরপর যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোতে বিরোধী দল অংশ নেয়নি অর্থাৎ নির্বাচন বর্জন করেছে। আর ২০২৪ সালে যা হয়েছে, সেখানে কার্যত নামমাত্র বা ছায়া বিরোধী দল ছিল।

এরপর শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য। এ কারণেই পশ্চিমা দেশগুলো কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছে যে এমন একজন ব্যক্তি দায়িত্বে আছেন, যিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে আরেকটি বিষয়ও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি নির্দিষ্ট মাত্রার স্থিতিশীলতা চায়।

তাদের ধারণা, নির্বাচন হলে এক ধরনের স্থিতিশীলতা আসবে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা হলো—ডিসেম্বর মাসটি ছিল অত্যন্ত সহিংস এবং বাংলাদেশে নির্বাচন সাধারণত সহিংসই হয়ে থাকে। তাই পশ্চিমা দেশগুলোর একটা অবস্থান হলো, অন্তত একটি নির্বাচন হোক, যদিও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখানে নিষিদ্ধ। অনেক পশ্চিমা পর্যবেক্ষকও বলেছেন, এই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।

তারা তো নির্বাচনকে সমর্থন করছে।

রুদাবেহ্ শহীদ : কেন তারা চুপ থেকে বা নীরবে এই নির্বাচনকে সমর্থন দিচ্ছে—এটি মিশ্র একটা বিষয়। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা, আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ কয়েক সপ্তাহ আগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে নির্বাচনটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাস এবং তাদের কর্মীরা এ বিষয়ে আগের মতো খুব উচ্চকণ্ঠ নন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তাঁদের অবস্থান কী হয়, সেটাই দেখার বিষয়। তবে সামগ্রিকভাবে আমি আপনার সঙ্গে একমত যে তাঁরা এখন খুব মেপে, হিসাব করে কথা বলছেন।

বিগত নির্বাচনগুলো নিয়ে সমালোচনা হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা দেখা গেছে—কে কার আগে নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানাতে পারে। এগুলোও কি বর্তমানে মেপে কথা বলার কারণ?

রুদাবেহ্ শহীদ : এটা হতে পারে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেস হোক বা বিজেপি—সব সময়ই আওয়ামী লীগের প্রতি কিছুটা নমনীয় থেকেছে। তারা কার্যত সব ডিম এক ঝুড়িতেই রেখেছে।

চীন আবার ভিন্নভাবে চিন্তা করে। তারা যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তার সঙ্গেই কাজ করতে আগ্রহী। বিএনপি সরকারের সঙ্গেও চীনের ভালো সম্পর্ক ছিল। তাইওয়ান নিয়ে একটা ইস্যু হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের সময় চীন বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছিল। আগে তো ভারত ছিল। পরে চীন সেই অবস্থানে চলে আসে। বাংলাদেশে চীনের বড় বিনিয়োগ আছে। বাংলাদেশ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই)’ অংশ।

এখানে পশ্চিমা সরকারগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। মায়ানমারের রাখাইনে চীনের বড় বিনিয়োগ আছে। মায়ানমারের নির্বাচনে চীন পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে।

নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে বাংলাদেশের সম্পর্কে কী প্রভাব পড়বে? ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময় পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের ইস্যুতে সরব ছিল না।

রুদাবেহ্ শহীদ : যেই ক্ষমতায় আসবে তাকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। ড. ইউনূসের সরকারের সময় তারা হয়তো অনেক নীরব ছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেসব বিষয় আসার কথা, সেগুলো হয়তো সেভাবে আসেনি। বাংলাদেশের নতুন সরকারকে কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে খুব সতর্ক হতে হবে। আমার মনে হয়, বিএনপি বা জামায়াত—উভয়েই এ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

এ সপ্তাহে আপনি একটি নিবন্ধে লিখেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রভাব আশপাশের দেশগুলোতে পড়তে পারে। নেপাল, ভারতের কথা লিখেছেন?

রুদাবেহ্ শহীদ : অবশ্যই। নেপালেও জেন-জি আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু সেটা ছিল খুবই স্বল্পমেয়াদি—মাত্র দুই দিনের। বাংলাদেশে আন্দোলন কিন্তু প্রায় এক মাস ধরে চলেছে। এরপর সরকারের পতন হলো। নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর। সেখানে জোট সরকার বারবার ভেঙেছে। প্রায় প্রতি ৯ মাসে নির্বাচন হয়েছে। পাঁচ বছরে তাদের ১১ জন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। নেপালি কংগ্রেস, মাওবাদী দল, কমিউনিস্ট দল—সব মিলিয়ে সেখানে এক ধরনের ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ চলত। আরেকটি বড় পার্থক্য হলো—নেপাল জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ। নেপালে পাহাড়, সমতল—সব জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও আলাদা রাজনৈতিক দল রয়েছে।

জেন-জি আন্দোলনের পর নেপালে একটি নির্বাচন হয়। সেখানে জেন-জি ও আলফা ডিসকোর্ডে নির্বাচন করে সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন করে। তিনি  অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন। সব দলই নির্বাচনে অংশ নেয়, এমনকি নতুন ছাত্রদলও গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে কিন্তু একটি বড় রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ—এটাই মৌলিক পার্থক্য। আওয়ামী লীগের অবশ্যই কর্তৃত্ববাদী ইতিহাস আছে। নেপালে এমনটি ছিল না। সেখানেও ছাত্ররা একটি দল করেছে। আরো অনেক পক্ষ সেখানে আছে।

ভারতের ক্ষেত্রে?

রুদাবেহ্ শহীদ : আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভারতের রাজ্য নির্বাচন। মার্চ থেকে নির্বাচন শুরু হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে। বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রভাব সরাসরি সেখানে পড়তে পারে।

ভারতের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ধারণা, বিশেষ করে বিজেপির মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে যাচ্ছে। আসামে তো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আন্দোলন ‘বাঙ্গাল খেদাও’ বহুদিনের—স্বাধীনতার আগের সময় থেকেই। এখন হয়ে গেছে, ‘বাংলাদেশি খেদাও’।

পশ্চিমবঙ্গে এখন ভোটার তালিকা যাচাই নিয়ে বিতর্ক চলছে। তৃণমূল কংগ্রেসসহ অনেক নাগরিক সংগঠন বলছে, এটি মুসলমানদের টার্গেট করার একটি কৌশল।

বিজেপির অভিযোগ হলো, বাংলাদেশ থেকে মুসলমান এনে জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলানো হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে যে অস্থির সময় চলছে এবং সংখ্যালঘু ইস্যুগুলো যেভাবে সামনে আসছে, তার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের রাজনীতিতে পড়বেই।

জামায়াত নেতাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যোগাযোগ কি হঠাৎ বেড়ে গেল?

রুদাবেহ্ শহীদ : এখন হয়তো জামায়াতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যোগাযোগের খবর গণমাধ্যমে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র তো সব সময় সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এখন জামায়াত উদীয়মান শক্তি। কূটনীতিতে এটা স্বাভাবিক। শুধু ক্ষমতাসীন দল নয়, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ—এমনকি হেফাজতের মতো সংগঠনের সঙ্গেও তাদের আলোচনা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মেয়াদের শেষ দিকে এসে বেশ কিছু চুক্তি হলো। এগুলোর প্রভাব কী হতে পারে?

রুদাবেহ্ শহীদ : এগুলো বাংলাদেশের আগামী সরকারের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। কারণ কী চুক্তি হয়েছে, কতটা চুক্তি হয়েছে—সবকিছু জনসমক্ষে নেই। যে সরকারই আসুক, তাদের এসব চুক্তি সামাল দিতে হবে। এগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?

রুদাবেহ্ শহীদ : জেন-জি আন্দোলনে কিছু জায়গায় সরকারের পতন ঘটেছে, কিছু জায়গায় পতন ঘটেনি। যেখানে সরকারের পতন ঘটে, সেখানে খুব বিক্ষুব্ধ সময় পার হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বড় রাজনৈতিক দল কার্যত নিষিদ্ধ হয়েছে। এটি আগামী দিনগুলোর অনেক কিছুর জন্য ‘টিন্ডার বক্স’ (বারুদের স্তূপ) হয়ে থাকবে। বাংলাদেশে এখন যে সরকার আসবে, তাকে অনেক অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকে মোকাবেলা করতে হবে। রক্ষণশীল, উদার ও মধ্যপন্থী—সব গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ অনেক পক্ষ সক্রিয়। বিএনপি ও জামায়াত—দুটো দলেরই দক্ষ পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত টিম রয়েছে। তাই আমি বলব, সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো আসছে, সেগুলো মোকাবেলার সক্ষমতা তাদের আছে।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন