যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হলেন এল-সায়েদ
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং আরব ও মুসলিম আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্বের বিষয় সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তবে ভোট গণনা শেষ না হওয়ায় এখনো তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত গণনা করা ভোটের ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ পেয়েছেন এল-সায়েদ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পেয়েছেন ৪৪ শতাংশ ভোট। নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এল-সায়েদকে পেছনে ফেলতে বাকি ভোটের অন্তত ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ পেতে হবে রজার্সকে।
মিশিগানের সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং অভিবাসী পরিবারের সন্তান এল-সায়েদের নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্যসেবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি। বিশেষ করে মুসলিম পরিচয়কে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও তিনি ভোটারদের সামনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও চিকিৎসাসেবার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রচার
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচনী প্রচার আরও জোরদার করেন এল-সায়েদ। ২৮ অক্টোবর মিশিগানের ওয়াইয়ানডটে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলার সময় ফেডারেল মেডিকেইড কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দ কমানোর সমালোচনা করেন তিনি।
এল-সায়েদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো অভ্যন্তরীণ খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরদিন সিনেটর এলিসা স্লটকিনের সঙ্গে ওয়েস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলার অডিটোরিয়ামে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন এল-সায়েদ। নীতিগত বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তাঁর সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন স্লটকিন।
এ সময় নিজের মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আক্রমণেরও জবাব দেন এল-সায়েদ। তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তির নাম কিংবা ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাই নির্বাচনের মূল আলোচ্য হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমার নাম ও ধর্মবিশ্বাসের কারণে আপনারা বাজারের খরচ বহন করতে পারছেন না, এমন নয়। আমার নাম ও ধর্মবিশ্বাসের কারণে আপনাদের জ্বালানি কিনতে সমস্যা হচ্ছে, এমনও নয়। আমার নাম ও ধর্মবিশ্বাসের কারণে আপনারা চিকিৎসকের কাছে যেতে পারছেন না, সেটিও নয়।’
মুসলিম পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডেমোক্র্যাট শিবিরে বিভক্তি, রজার্সকে সমর্থন স্টিভেন্সের
নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও প্রকাশ্যে আসে। এল-সায়েদের সাবেক দলীয় মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান।
এর আগে একটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের নিন্দা জানাতে এল-সায়েদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন স্টিভেন্স। বিজ্ঞাপনটি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তৈরি ছিল। এতে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা এবং গাজা যুদ্ধের বিষয় তুলে ধরা হয়।
এল-সায়েদ জানান, বিজ্ঞাপনটি তাঁর নির্বাচনী প্রচার দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এবং তিনি এর বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন।
১ নভেম্বর একটি গির্জার অনুষ্ঠানে রজার্সের পাশে উপস্থিত হওয়ার পর স্টিভেন্স তাঁর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। এর আগে ৭ আগস্ট সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেকে মিশিগানের একজন জায়নিস্ট ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন স্টিভেন্স।
ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই প্রার্থীর অবস্থান নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্টিভেন্সের অবস্থান পরিবর্তনের সমালোচনা করেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কয়েকজন নেতা। তবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে ভোটারদের সমস্যা নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানান এল-সায়েদ।
তিনি বলেন, ‘দিন শেষে আমি আসলে হ্যালি স্টিভেন্সকে নিয়ে ভাবছি না। রাজনীতির চেয়ে নীতিগত বিষয়গুলো নিয়েই আমার আগ্রহ বেশি। মিশিগানের এক কোটি মানুষ সরকারের কাছ থেকে আরও ভালো সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন।’
তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত দামে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন। তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার মান, বাতাসের গুণগত মান এবং পানীয় জলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
স্টিভেন্স রজার্সকে সমর্থন জানানোর পর এক দিনেই এল-সায়েদের নির্বাচনী তহবিলে ৬৫ হাজারের বেশি দাতার কাছ থেকে ২৪ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ জমা পড়ে।
শেষ মুহূর্তের প্রচারে ওয়ারেন ও শ্রমিক সংগঠন
২ নভেম্বর ইয়েপসিলান্টির ইস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনের সঙ্গে শেষ নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেন এল-সায়েদ।
এ ছাড়া ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্সের আয়োজিত অনুষ্ঠানেও একাধিকবার বক্তব্য দেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারের বিভিন্ন পর্যায়ে বর্ণ, ধর্ম ও পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে সংহতির ওপর গুরুত্ব দেন এল-সায়েদ। অভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সামনে রেখে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল তাঁর প্রচারের অন্যতম লক্ষ্য।
ভোট গণনায় রজার্সের চেয়ে এগিয়ে এল-সায়েদ
৩ নভেম্বর নির্বাচনের রাতে মিশিগানের সিনেট আসনের ভোট গণনায় এগিয়ে ছিলেন এল-সায়েদ।
রাত ১১টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যাশিত মোট ভোটের প্রায় ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ গণনা সম্পন্ন হয়েছিল। তখন এল-সায়েদ পেয়েছিলেন ১০ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০ ভোট। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পেয়েছিলেন ৯ লাখ ৪৭ হাজার ১৪১ ভোট।
নির্বাচনের আগের জরিপগুলোতেও এগিয়ে ছিলেন এল-সায়েদ। মিচেল রিসার্চের জরিপে তিনি ৫১ শতাংশ এবং রজার্স ৪৪ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমসের জরিপে এল-সায়েদের সমর্থন ছিল ৫৩ শতাংশ, রজার্সের ৪২ শতাংশ। একটি নির্বাচনী পূর্বাভাসে এল-সায়েদের জয়ের সম্ভাবনা ৮৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
নির্বাচনের দিন সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমারও এল-সায়েদের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলায় মিশিগানের ভোটারদের সমর্থন পেয়েছেন এল-সায়েদ।
আরব ও মুসলিম আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্বে নতুন সম্ভাবনা
এল-সায়েদের এগিয়ে থাকা শেষ পর্যন্ত বিজয়ে রূপ নিলে মিশিগানের রাজনীতিতে আরব ও মুসলিম আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে একজন চিকিৎসক ও সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তার মার্কিন সিনেটে যাওয়ার পথ তৈরি হবে।
তাঁর নির্বাচনী প্রচার যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হয়েছে। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। বর্তমানে উভয় কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। ডেমোক্র্যাটরা অন্তত একটি কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
ভোট গণনা শুরুর পর বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে ফল আসতে শুরু করেছে। ভার্জিনিয়ার সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মার্ক ওয়ার্নারকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, মিশিগান, ওহাইও ও টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনের সর্বশেষ অবস্থা: ৩ নভেম্বর ২০২৬, রাত ১১টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত মিশিগানের সিনেট নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হয়নি।