ইরানে ফের হামলার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের, নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপ
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪২ এএম
ইরানে পুনরায় বিমান হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু টেলিফোনে কথা বলেছেন। ইরানে আরও দুটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে দুই নেতার মধ্যে ফোনালাপ হয়। পরে পাম বিচে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প নিজেই জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আরও দুটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে চায়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখনো অন্তত দুটি জায়গায় আঘাত হানতে হবে। তবে কাজটি করতে ১০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না। সম্ভবত আপনারা পিক্স্যাক্স পর্বতের কথা জেনে থাকবেন। ওখানকার সমস্যাটি আমাদের মেটাতে হবে।’
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, পিক্স্যাক্স পর্বতটি সম্ভবত পারমাণবিক অস্ত্র বা কাঁচামাল সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করছে ইরান। চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ওই স্থানে কোনো হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘ঠিকঠাক এগিয়ে চলেছে’। তবে দেশটিকে ‘খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যাতে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেরা জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার দোহার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন ইরানি প্রতিনিধিরা। উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ বন্ধের উপায় খুঁজতেই তাঁরা আলোচনা করছেন বলে রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্রের মতে, দোহার বৈঠকের আগে শুক্রবার তেহরানেও ইরানি ও কাতারি প্রতিনিধিদের মধ্যে টানা ১২ ঘণ্টার বেশি সময় আলোচনা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আশঙ্কা, মার্কিন নির্বাচন শেষ হলেই ট্রাম্প আবারও ইরানে সামরিক অভিযান জোরদার করতে পারেন। অন্যদিকে ইরানও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো নতুন হামলার জবাব প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হেনে দেওয়া হবে।
নির্বাচনের পরদিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর থেকে ইরানে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র আকারের নতুন হামলা চালানো হতে পারে। সম্ভাব্য এই আক্রমণ মোকাবিলায় উপসাগরীয় মিত্রদের প্রস্তুত থাকার বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন শীর্ষ আরব কর্মকর্তার বরাতে শনিবার এমএস নাউ এ খবর জানিয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে হামলা না চালিয়ে ওয়াশিংটনকে সংকট নিরসনের তাগিদ দিচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে ইরানের তীব্র পাল্টা জবাব পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।
গত ১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ওয়াশিংটন ইরানে নতুন করে বড় কোনো বিমান হামলা চালায়নি। মূলত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি শনিবার সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী পরে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যেকোনো আগ্রাসন প্রতিহত করতে তারা সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তা কর্মকর্তা মহসিন রেজাই শনিবার জানান, নতুন করে হামলা শুরু হলে পরমাণু অস্ত্র তৈরির ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে তেহরান। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে এক ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে পরমাণু অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করেছিলেন ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। তেহরানও বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে ইরান বর্তমানে যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, তা সাধারণ বেসামরিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের নিজ দেশের পরমাণু কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি অব্যাহত রেখেছে দেশটি। ২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত যুদ্ধের আগেই ইসরায়েল সতর্ক করেছিল, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছে।
রেজাই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের শর্তগুলো ওয়াশিংটন না মানা পর্যন্ত পরমাণু চুক্তি নিয়ে আর কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নিজেদের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার অবস্থানও জানিয়েছেন তিনি।
গত সেপ্টেম্বর থেকে ইরান সাত দফার একটি নিজস্ব শান্তি প্রস্তাব দিয়ে আসছে, যা এখন পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। ওই প্রস্তাবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, আটকে রাখা সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান-সমর্থিত জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। এসব শর্ত পূরণ হলেই কেবল নৌপথটি খুলে দেওয়া হবে।
রেজাই আরও বলেন, সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠানোর পর ওয়াশিংটনের সুর ‘পুরোপুরি বদলে গেছে’।
তিনি বলেন, ‘আমি চিঠিটি পড়েছি। এখনো কোনো জবাব দিইনি, তবে তাদের ভাষা এবার সম্পূর্ণ আলাদা।’ যুক্তরাষ্ট্রের এই নরম সুরকে ‘ইতিবাচক লক্ষণ’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এর মধ্য দিয়ে ইরানের জয় সুসংহত হয়েছে।
তবে চিঠিটি নিয়ে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি রেজাই। কবে নাগাদ জবাব পাঠাবেন, সেটিও স্পষ্ট করেননি তিনি।
কাতার পরোক্ষভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার কাজ করে গেলেও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা শনিবার সকালেও স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরাসরি কোনো মার্কিন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে বসার পরিকল্পনা তাঁদের নেই।
চলমান এই সংকটের সূচনা হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ইরান সরকারের পতন ঘটানো এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্যে ইরানে যৌথ হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
পরে জুন মাসে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির একটি সমঝোতা স্মারকে সই করতে সম্মত হয়েছিল তেহরান ও ওয়াশিংটন। কিন্তু এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তোলায় সেই আলোচনা দ্রুত ভেঙে পড়ে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল