বিয়ের যৌতুক হিসেবে বোম্বে, সেখান থেকেই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্থান
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৩ এএম
১৭৫৪ সালে বোম্বে ও মালাবার উপকূল। ছবি: বিবিসি বাংলা
ইতিহাসে রাজকীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক জোট গঠনের বহু উদাহরণ রয়েছে। তবে এমন বিয়ে খুব কমই দেখা যায়, যার যৌতুক হিসেবে পাওয়া একটি ভূখণ্ড পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আর্থিক, বাণিজ্যিক ও চলচ্চিত্রকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস ও পর্তুগালের রাজকন্যা ক্যাথরিন অব ব্রাগানজার বিয়েতে এমনই এক ভূখণ্ড যৌতুক হিসেবে পেয়েছিল ইংল্যান্ড। সেটি ভারতের বোম্বে, যা বর্তমানে মুম্বাই নামে পরিচিত।
পর্তুগালের কাছ থেকে পাওয়া বোম্বে পরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে যায়। বছরে মাত্র ১০ পাউন্ড ভাড়ার বিনিময়ে কোম্পানিকে এই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বোম্বে ব্রিটিশদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। সেখান থেকেই ভারতে ব্রিটিশ ক্ষমতা বিস্তারের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
কিন্তু আরব সাগরের তীরবর্তী সাতটি ছোট দ্বীপ কীভাবে ইউরোপের দুই রাজপরিবারের রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হয়ে উঠেছিল? আর কীভাবেই বা যৌতুক হিসেবে পাওয়া এই ভূখণ্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে?
সাত দ্বীপের বোম্বে ও পর্তুগিজ শাসন
বর্তমান মুম্বাইয়ের মূল ভূখণ্ড একসময় কোলাবা, ওল্ড ওম্যানস আইল্যান্ড বা লিটল কোলাবা, বোম্বে, মাজগাঁও, পারেল, ওরলি ও মাহিম—এই সাতটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন স্থানীয় শাসকের অধীনে থাকা দ্বীপগুলো পরে পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ভাস্কো দা গামার ভারতে পৌঁছানোর পর দেশটির পশ্চিম উপকূলে ইউরোপীয় বাণিজ্য ও ঔপনিবেশিক প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়া জোরদার হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৫৩৪ সালে গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে বোম্বের সাতটি দ্বীপ পর্তুগালের নিয়ন্ত্রণে আসে।
পরে দ্বীপগুলো গোয়া, দমন, দিউ, বাসেইন—বর্তমান ভাসি—সহ পশ্চিম উপকূলের অন্যান্য পর্তুগিজ অধিকৃত অঞ্চলের অংশ হয়ে ওঠে। এসব অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের সরাসরি শাসনের অধীনে ছিল না। তবে মুঘলদের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। কখনো সহযোগিতা, আবার কখনো উত্তেজনার মধ্য দিয়ে এসব সম্পর্ক পরিচালিত হতো।
গোয়ায় অবস্থানরত পর্তুগিজ ভাইসরয়ের অধীনে বোম্বের প্রশাসন পরিচালিত হতো। পর্তুগিজ শাসনামলে সেখানে দুর্গ, গির্জা ও বাণিজ্যিক বসতি গড়ে ওঠে। তবে অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল এর প্রাকৃতিক গভীর সমুদ্রবন্দর। ভবিষ্যতে বোম্বেকে বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে এই ভৌগোলিক সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইংল্যান্ড-পর্তুগাল জোটের পেছনের রাজনীতি
বোম্বে যৌতুক হিসেবে দেওয়ার পেছনে শুধু রাজপরিবারের বিয়ে নয়, ইউরোপের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৫৮০ থেকে ১৬৪০ সাল পর্যন্ত পর্তুগাল স্পেনের শাসনের অধীনে ছিল। স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের পরও স্পেন পর্তুগালের স্বাধীনতাকে পুরোপুরি মেনে নেয়নি। ফলে স্পেনের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পর্তুগালের একটি প্রভাবশালী মিত্র প্রয়োজন ছিল।
ইতিহাসবিদ এডগার প্রেস্টিজের মতে, চতুর্দশ শতক থেকেই ইংল্যান্ড পর্তুগালের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিল। সপ্তদশ শতকে এসে সেই সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সঙ্গেও স্পেনের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। স্পেনের সঙ্গে তাঁর চুক্তি থাকলেও বিভিন্ন বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। স্পেন জ্যামাইকাসহ ব্রিটিশদের দখলে থাকা কিছু ভূখণ্ড ফেরত দাবি করছিল।
এমন পরিস্থিতিতে পর্তুগাল ও ইংল্যান্ডের মধ্যে রাজকীয় বিয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পর্তুগালের রাজা চতুর্থ জনের কন্যা ক্যাথরিন অব ব্রাগানজাকে দ্বিতীয় চার্লসের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব সামনে আসে।
ইতিহাসবিদ অ্যালাস্টেয়ার ম্যালকম ও পিয়ার্স বেকার-বেটসের লেখায় উঠে এসেছে, স্পেনের রাজা চতুর্থ ফিলিপ পর্তুগালের ব্রাগানজা রাজবংশের বিরোধী ছিলেন। তিনি চাইতেন না, ক্যাথরিনের সঙ্গে এমন কোনো শক্তিশালী ইউরোপীয় শাসকের বিয়ে হোক, যার মাধ্যমে পর্তুগালের আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। এ কারণে স্পেন দ্বিতীয় চার্লসের জন্য অন্য ইউরোপীয় রাজকন্যাদের নাম প্রস্তাব করেছিল বলে ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন।
তবে স্পেনের বিরোধিতা সত্ত্বেও পর্তুগাল ও ইংল্যান্ডের মধ্যে বিয়ের আলোচনা এগিয়ে যায়। এস এম ওয়েইনের লেখা অক্সফোর্ড ডিকশনারি অব ন্যাশনাল বায়োগ্রাফি অনুযায়ী, ১৬৬১ সালের ২৩ জুন দুই দেশের মধ্যে বিয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
যৌতুকে কী কী পেয়েছিল ইংল্যান্ড?
রাজকীয় বিয়ের চুক্তিতে ক্যাথরিনের যৌতুক হিসেবে শুধু অর্থ বা সম্পদ নয়, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও বাণিজ্যিক সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এস এম ওয়েইনের বিবরণ অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় ইংল্যান্ডের পাওয়ার কথা ছিল উত্তর আফ্রিকার তাঞ্জিয়ার, ভারতের বোম্বের সাতটি দ্বীপ, ব্রাজিল ও পর্তুগিজ ইস্ট ইন্ডিজে বাণিজ্যিক সুবিধা এবং পর্তুগালে বসবাসরত ইংরেজদের জন্য ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক স্বাধীনতা। এর পাশাপাশি পর্তুগাল থেকে ২০ লাখ ক্রাউন দেওয়ার কথা ছিল, যার মূল্য আনুমানিক তিন লাখ পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর বিনিময়ে পর্তুগাল স্পেনের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের সামরিক ও নৌসহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডে ক্যাথরিনের ক্যাথলিক ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অর্থাৎ এই বিয়ে ছিল দুই রাজপরিবারের ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এর মাধ্যমে ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনের পথ তৈরি করেছিল।
চুক্তির ১১ নম্বর ধারায় বোম্বের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়েছিল, বোম্বের শান্তিপূর্ণ দখল দ্রুত ও কার্যকরভাবে ইংল্যান্ডের রাজা অথবা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
এস এম ওয়েইনের বিবরণে আরও বলা হয়েছে, বোম্বের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্রিটিশ নৌবহর পৌঁছালে ইস্ট ইন্ডিজে বসবাসরত পর্তুগিজদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, তাদের বাণিজ্য ও নৌচলাচলে সহায়তা এবং নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ থাকার কথা ছিল।
তবে বোম্বের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর পাওয়ার পরিকল্পনা ইংল্যান্ডের জন্য একেবারে নতুন ছিল না। পি জে স্টার্ন তাঁর দ্য কোম্পানি স্টেইট: করপোরেট সভারেইনটি অ্যান্ড দ্য আর্লি মডার্ন ফাউন্ডেশন অব ব্রিটিশ এম্পায়ার ইন ইন্ডিয়া বইয়ে লিখেছেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর আগেও ভারতে উপযুক্ত বন্দর বা ভূখণ্ড অধিগ্রহণের বিভিন্ন পরিকল্পনা বিবেচনা করেছিল।
স্টার্নের বিবরণ অনুযায়ী, ১৬৫৪ সালে কোম্পানি ইংল্যান্ডের তৎকালীন শাসক অলিভার ক্রমওয়েলের কাছে একটি পর্তুগিজ দুর্গঘেরা এলাকা অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে মোজাম্বিক, মহারাষ্ট্রের ভাসি এবং বোম্বের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব পরিকল্পনার কিছুতে সামরিক অভিযান বা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ভূখণ্ড অধিগ্রহণের ধারণাও ছিল।
বোম্বে হস্তান্তরে পর্তুগিজদের বাধা
১৬৬২ সালের ২১ মে দ্বিতীয় চার্লস ও ক্যাথরিন অব ব্রাগানজার বিয়ে হয়। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর রাজদম্পতি লন্ডনে পৌঁছান। কিন্তু বিয়ের চুক্তিতে বোম্বে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর সহজ ছিল না।
ভারতে অবস্থানরত পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে ভাইসরয় আন্তোনিও দে মেলো কাস্ত্রো, বোম্বে হস্তান্তরের বিরোধিতা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বোম্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এর নিয়ন্ত্রণ হারালে পর্তুগালের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া চুক্তির আওতায় ঠিক কোন ভূখণ্ড হস্তান্তর করতে হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। রাজকীয় আদেশটি শুধু বোম্বে দ্বীপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, নাকি এর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকা সংলগ্ন এলাকাগুলোকেও এর আওতায় আনতে হবে—এ নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়।
ফলে ১৬৬২ সালে বোম্বের নিয়ন্ত্রণ নিতে আসা ইংরেজ নৌবহরকে উপকূলে নামার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এতে হস্তান্তর প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়।
গেজেটিয়ার অব দ্য বোম্বে প্রেসিডেন্সি অনুসারে, পর্তুগিজ সাম্রাজ্য রক্ষা এবং রাজকীয় বিয়ের চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একই সামরিক বাহিনীকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বোম্বে হস্তান্তর নিয়ে বিরোধের কারণে তারা গুরুতর সমস্যায় পড়ে। পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষের বাধা ও বিলম্বের মধ্যে অনেক সৈন্য রোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার শিকার হন বলে ওই বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় বোম্বের স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টাও হয়েছিল। এম ভি কামাথ তাঁর টাইডস অব টাইম বইয়ে লিখেছেন, বোম্বের এক ব্রাহ্মণ ব্রিটিশদের জানিয়েছিলেন, পর্তুগিজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হিন্দুরা বিদ্রোহ করতে প্রস্তুত। ব্রিটিশরা বাইরে থেকে আক্রমণ চালালে তারা সহায়তা করতে পারে—এমন ধারণার ভিত্তিতে একটি সামরিক অভিযান প্রস্তুত করা হয়েছিল।
কামাথের বিবরণ অনুযায়ী, বোম্বে দখলের উদ্দেশ্যে একটি জাহাজ পাঠানো হলেও অভিযানটি ব্যর্থ হয়। সৈন্যদের মধ্যে মদ্যপান এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৪৫০ জনের মধ্যে ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এসব বাধা ও ব্যর্থতার কারণে বোম্বের আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর সম্পন্ন হতে কয়েক বছর লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৬৬৫ সালে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তবে এর পরও বিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়নি। বোম্বে বিফোর দ্য ব্রিটিশ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, হস্তান্তরের প্রায় দুই মাস পর পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে একটি রাজকীয় আদেশ পাঠানো হয়, যাতে প্রক্রিয়াটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ ছিল। কিন্তু তত দিনে ব্রিটিশরা বোম্বের বিভিন্ন অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে ফেলেছিল।
তারা মাজগাঁও, পারেল এবং পরে মাহিম দখল করে। এসব এলাকা বোম্বের সংলগ্ন—এই যুক্তিতে ব্রিটিশরা নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের দাবি জানায়। পরে সংলগ্ন অন্যান্য দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
বছরে মাত্র ১০ পাউন্ড ভাড়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হস্তান্তর
বোম্বের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর ইংল্যান্ডের রাজশক্তি দ্রুত বুঝতে পারে, দূরবর্তী এই ভূখণ্ড পরিচালনা করা ব্যয়বহুল। তখন এটি থেকে উল্লেখযোগ্য আয়ও হচ্ছিল না। ফলে বোম্বে রাজকীয় সম্পত্তি হিসেবে ধরে রাখার অর্থনৈতিক সুবিধা সীমিত ছিল।
একই সময়ে উত্তর আফ্রিকার তাঞ্জিয়ারও ব্রিটিশদের জন্য ব্যয়বহুল ও সমস্যাসংকুল হয়ে ওঠে। স্থানীয় মরোক্কান বাহিনীর ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত ১৬৮৪ সালে ব্রিটিশরা তাঞ্জিয়ার ছেড়ে চলে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে ১৬৬৮ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লস বোম্বে ও সংলগ্ন দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দেন। এর বিনিময়ে কোম্পানিকে বছরে মাত্র ১০ পাউন্ড ভাড়া দিতে হতো। পাশাপাশি কোম্পানি রাজাকে ছয় শতাংশ বার্ষিক সুদে ৫০ হাজার পাউন্ড ঋণ দেয়।
এই হস্তান্তর বোম্বের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। এর আগে কোম্পানি ভারতের পশ্চিম উপকূলে সুরাট থেকে বাণিজ্য পরিচালনা করত। কিন্তু বোম্বে পাওয়ার ফলে তারা নিজেদের পতাকার অধীনে একটি নিরাপদ বন্দর গড়ে তোলার সুযোগ পায়।
বোম্বের প্রাকৃতিক গভীর সমুদ্রবন্দর, কৌশলগত অবস্থান এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে বোম্বে শুধু বাণিজ্য পরিচালনার জায়গা নয়, বরং প্রশাসন ও সামরিক কার্যক্রমেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
দ্বিতীয় চার্লস ও ক্যাথরিন অব ব্রাগানজার কোনো সন্তান হয়নি। তবে তাঁদের বিয়ের চুক্তির মাধ্যমে বোম্বে ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে আসা এবং পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে যাওয়ার ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
বোম্বে থেকে ব্রিটিশ শক্তির বিস্তার
জেমস ডগলাস তাঁর অ্যা বুক অব বোম্বে বইয়ে লিখেছেন, বোম্বে হস্তান্তরের চুক্তি শুধু একটি ভূখণ্ডের মালিকানা বদলের ঘটনা ছিল না। এটি এমন একটি ভিত্তি তৈরি করেছিল, যার ওপর পরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ব্রিটিশ রাজ ভারতে নিজেদের ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তোলে।
তবে বোম্বে শুরু থেকেই ব্রিটিশদের জন্য সমৃদ্ধ বা সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য অঞ্চল ছিল না। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুসারে, ওই অঞ্চলে মুঘল, মারাঠা, পর্তুগিজ ও ডাচদের প্রভাব ছিল। ফলে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বোম্বেকে নিজেদের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত করতে হয় ব্রিটিশদের।
অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ এবং উনিশ শতকের শুরুর দিকে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন, মারাঠা সংঘাত ও গুজরাটের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ী ও কারিগরদের একটি অংশ বোম্বের দিকে আসতে শুরু করেন। এতে শহরটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়ে। ১৮৪৫ সালের মধ্যে সাতটি দ্বীপ একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা উল্লেখ করেছে। এর ফলে শহরের যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।
উনিশ শতকে বোম্বের অর্থনৈতিক বিকাশে তুলাশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুসারে, ১৮৫৭ সালে সেখানে প্রথম তুলার কল স্থাপিত হয়। ১৮৬০ সালের মধ্যে বোম্বে ভারতের সবচেয়ে বড় তুলাবাজারে পরিণত হয়। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হওয়ার পর ব্রিটেন ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যে শহরটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
ব্রিটিশ শাসনামলে বোম্বে প্রেসিডেন্সির রাজধানী হিসেবে শহরটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করে। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পর্তুগিজ শাসনের অবসান ও মুম্বাইয়ের বর্তমান পরিচয়
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করে। তবে উপমহাদেশে পর্তুগিজদের ঔপনিবেশিক উপস্থিতি তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। পর্তুগিজ ভারতের অন্তর্ভুক্ত গোয়া, দমন ও দিউ ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় সামরিক অভিযানের পর ভারতের নিয়ন্ত্রণে আসে।
অন্যদিকে বোম্বে ব্রিটিশ শাসনের সময় গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে স্বাধীন ভারতের অন্যতম প্রধান নগরীতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে শহরটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প, বাণিজ্য ও চলচ্চিত্রশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। বর্তমানে মুম্বাই ভারতের অর্থনীতি ও বিনোদনশিল্পের অন্যতম প্রধান শহর।
দ্বিতীয় চার্লস ও ক্যাথরিন অব ব্রাগানজার বিয়ের চুক্তি তাই কেবল দুই রাজপরিবারের সম্পর্কের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ডের সামরিক সমঝোতা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ভারতে ব্রিটিশ ক্ষমতার বিস্তারের দীর্ঘ ইতিহাস।
যে বোম্বে একসময় রাজকীয় বিয়ের যৌতুকের অংশ ছিল, সেটিই পরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সেই শহরই বিকশিত হয়ে আজকের মুম্বাই—বিশ্বের অন্যতম পরিচিত আর্থিক, বাণিজ্যিক ও চলচ্চিত্রকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা