নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান রোনেনের মামলা
৭ অক্টোবরের হামলার দায় চাপানো ও মিথ্যা অভিযোগের দাবি, নির্বাচনের আগে নতুন বিতর্ক
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার দায় চাপানো এবং মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের সাবেক প্রধান রোনেন বার। আগামী ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে এ মামলা ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বুধবার ১৩৪ পৃষ্ঠার নথিসহ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন রোনেন বার। এতে তিনি অভিযোগ করেন, নিজের দায় আড়াল করতে নেতানিয়াহু মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় তার ওপর চাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
রোনেন বারের ভাষ্য, সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত পাওয়ার পরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিবকে ফোন করেছিলেন। সরাসরি নেতানিয়াহুর সঙ্গে যোগাযোগের কোনো নম্বর তার কাছে না থাকায় তিনি সামরিক সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তবে নেতানিয়াহুর দাবি, ওই দিন ভোরে হামলার বিষয়ে রোনেন বার তাকে আগাম কোনো তথ্য দেননি। শিন বেতের তৎকালীন প্রধান কিংবা সামরিক কর্মকর্তারা ফোন করে তাকে সতর্ক করলে তিনি হামলাটি ঠেকাতে পারতেন বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
মামলার নথিতে রোনেন বার অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ‘সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ’ তুলে ৭ অক্টোবরের হামলার দায় থেকে জনদৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছেন। তার দাবি, নেতানিয়াহুর সরকারের কয়েক বছরের নীতির কারণে গাজায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি আরও বেড়েছিল।
লিকুদ পার্টির পাল্টা বক্তব্য
রোনেন বারের অভিযোগের জবাবে বুধবার নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি বিবৃতি দিয়েছে। এতে সাবেক গোয়েন্দাপ্রধানের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলা হয়, ‘রোনেন, আপনি কি রসিকতা করছেন?’
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর জরুরি যোগাযোগের নম্বর রোনেন বারের কাছে ছিল। অন্য নিরাপত্তাপ্রধানদের মতো তিনিও চাইলে সরাসরি নেতানিয়াহুকে ফোন করতে পারতেন। সময়মতো একটি ফোন করা হলে আরও অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো কি না, সে প্রশ্নও তোলে দলটি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুনে শিন বেতের প্রধানের পদ ছাড়েন রোনেন বার। শুরু থেকেই তার দাবি, হামলার হুমকি সম্পর্কে তিনি আগেই নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন।
ফোনালাপের নথি বদলের অভিযোগ
নেতানিয়াহুর সাবেক সামরিক সচিব অবি গিলের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের কয়েক দিনের মাথায় রোনেন বারের মামলার খবর সামনে এল। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অবি গিল অভিযোগ করেন, ৭ অক্টোবরের ঘটনাবলির রেকর্ড বা নথিপত্রে কারচুপি করা হয়েছে। এমনকি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের সময়ও পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত নেতানিয়াহুর সামরিক সচিবের দায়িত্ব পালন করা অবি গিল জানান, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক স্টেনোগ্রাফার তার কাছে আসেন। ওই নারী তাকে জানান, নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফের নির্দেশে স্থানীয় সময় ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে হওয়া চার মিনিটের একটি ফোনালাপের নথিতে সময় পরিবর্তন করে ভোর ৬টা ২৯ মিনিট দেখাতে বলা হয়েছে।
অবি গিলের ভাষ্য, ওই স্টেনোগ্রাফার তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি নথিতে এ পরিবর্তন করতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিরুদ্ধে ফোনালাপের রেকর্ডে কারচুপির অভিযোগ তুলে অবি গিল বলেন, ঘটনাগুলো শতভাগ সত্য এবং এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই।
মিসরের আগাম সতর্কবার্তার দাবি
এদিকে গত মাসে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হামাসের হামলার আগে মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান আব্বাস কামেলও নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার কয়েক দিন আগে আব্বাস কামেল সরাসরি নেতানিয়াহুকে ফোন করে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক করেন। এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল সফর করে দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সাবেক কর্মকর্তা, সরকারি আমলা ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের সমালোচনার মুখে পড়ছেন নেতানিয়াহু। ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা এবং পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তার সরকারের ভূমিকা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
৭ অক্টোবরের হামলা ও গাজায় প্রাণহানি
ইসরায়েলের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের যোদ্ধারা সীমান্ত বেড়া ভেঙে ইসরায়েলে প্রবেশ করলে অন্তত ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন। এ ছাড়া ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। জিম্মিদের মধ্যে ওই দিন নিহত ৪৪ জনের মরদেহও ছিল।
এরপর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও তা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।