EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলে শিক্ষাসফরে বোমা বিস্ফোরণ, নিহত ১ আহত ২৪

ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম

ইসরায়েলে শিক্ষাসফরে বোমা বিস্ফোরণ, নিহত ১ আহত ২৪

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

বছরের পর বছর যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে ইসরায়েল। সংঘাত থামলেও দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলাবারুদ এখনো কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। এবার উত্তর ইসরায়েলের লেবানন সীমান্তবর্তী একটি বনাঞ্চলে স্কুলের শিক্ষাসফরে বিস্ফোরিত হয়েছে ক্লাস্টার বোমার একটি অংশ। এতে ১৩ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে আরও ২৪ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

সোমবার (১২ অক্টোবর) উত্তর ইসরায়েলের রামিম রিজ এলাকার নাফতালি মাউন্টেনস ফরেস্টে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ধারণা, বিভিন্ন সময়ের সংঘাতে ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকায় শত শত, এমনকি হাজার হাজার অবিস্ফোরিত অস্ত্র ছড়িয়ে থাকতে পারে।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে কয়েক ডজন ক্লাস্টার বোমার অংশ বহনকারী গ্র্যাড রকেট নিক্ষেপ করে। এসব রকেট থেকে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছোট ছোট বোমার অংশ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মাটিতে পড়ার পরও সেগুলো বিস্ফোরিত হয় না। ফলে দীর্ঘদিন পরও এসব অস্ত্র প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

যেভাবে ঘটল বিস্ফোরণ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেবানন সীমান্তের কাছে একটি প্রাকৃতিক পথ ধরে হাঁটার সময় ওআরটি মাআলত স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলটি অবিস্ফোরিত বোমার মুখোমুখি হয়।

শিক্ষাসফরের সময় এক শিক্ষার্থী পথের ওপর বা কাছাকাছি পড়ে থাকা হিজবুল্লাহর একটি সাবমিউনিশন দেখতে পেয়ে সেটি তুলে নেয়। একপর্যায়ে সেটি বিস্ফোরিত হলে নবম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী নিহত হয়। আহত হয় আরও ২৪ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক।

হিজবুল্লাহ ছাড়াও ইরান ও ইয়েমেনভিত্তিক হুথি গোষ্ঠী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লাস্টার বোমার অংশ বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলে নিক্ষেপ করেছে। এসব অস্ত্রের কিছু অংশ বিস্ফোরিত না হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সোমবারের মতো প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনা তুলনামূলক বিরল।

অবিস্ফোরিত এসব অস্ত্র সব সময় দৃশ্যমান থাকে না। গোলান মালভূমি ও পশ্চিম তীরসহ বিভিন্ন এলাকায় এগুলোর উপস্থিতি ঝুঁকি তৈরি করছে। বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ও খোলা জায়গায় এসব অস্ত্রের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করে বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা কর্তৃপক্ষের পক্ষে কঠিন।

অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী এগুলোর আকার ও বিস্ফোরণের ক্ষমতা ভিন্ন হতে পারে। কিছু অস্ত্রকে রকেট, গ্রেনেড বা ওয়ারহেড হিসেবে চেনা গেলেও অন্যগুলো ছোট ধাতব পাত্রের মতো সাধারণ বস্তু বলে মনে হতে পারে। ক্লাস্টার বোমা থেকে বিচ্ছিন্ন ছোট অংশও প্রাণঘাতী আঘাত হানতে সক্ষম।

আগেও ঘটেছে প্রাণহানির ঘটনা

অবিস্ফোরিত অস্ত্রের কারণে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা ইসরায়েলে নতুন নয়। গত আগস্টে উত্তরাঞ্চলীয় শহর মেতুলার কাছে একটি কৃষিজমিতে পুরোনো বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হলে ছয় বিদেশি শ্রমিক আহত হন। গত তিন বছরে ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘাত হয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তরাঞ্চলীয় কিবুতজ ইরোনের কাছে একটি বাগানে হিজবুল্লাহর আগে নিক্ষেপ করা একটি অস্ত্র বিস্ফোরিত হলে থাইল্যান্ডের ২৭ বছর বয়সী এক শ্রমিক নিহত হন। আহত হন আরেকজন।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জর্ডান উপত্যকায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রের কাছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) আগে নিক্ষেপ করা একটি অবিস্ফোরিত অস্ত্র বিস্ফোরিত হলে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরও দুই শিশু আহত হয়।

দায়িত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

ইসরায়েলে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণের দায়িত্ব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল মাইন অ্যাকশন অথরিটি, সামরিক বাহিনী ও পুলিশের মধ্যে ভাগ করা। ২০১১ সালের মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, অপসারণের পরিকল্পনা করা এবং কার্যক্রম পরিচালনা করা। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করাও তাদের কাজ।

তবে মঙ্গলবার আর্মি রেডিও জানায়, প্রাণঘাতী ঘটনার দায় নিতে অস্বীকার করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের ফলে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ তাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়; এটি পুলিশের কাজ।

সোমবার বিস্ফোরণের ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইসরায়েল পুলিশের কমিশনার ড্যানি লেভি। তবে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি তিনি। লেভি জানান, শিক্ষাসফরটির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আইডিএফ জানিয়েছিল, হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পর বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষকে বাড়িতে ফিরতে সহায়তা করতে উত্তর ইসরায়েলের প্রায় ৪০টি জনপদে অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে সামরিক সরঞ্জাম সরানো, বর্জ্য পরিষ্কার এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণের কাজ করা হয়েছিল। তবে চলতি বছরে হিজবুল্লাহর সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের পর একই ধরনের কোনো অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়নি সামরিক বাহিনী।

শিক্ষাসফরের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন

ইসরায়েল ট্রেইল ধরে তিন দিনের ওই শিক্ষাসফরের অনুমোদন দিয়েছিল দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ইহুদি জাতীয় তহবিল কেকেএল-জেএনএফের একটি সাইনবোর্ডে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে বন ও ক্যাম্পসাইটে প্রবেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসেও সংস্থাটির ওয়েবসাইটে একই ধরনের সতর্কবার্তা প্রকাশ করা হয়।

মঙ্গলবার আর্মি রেডিওকে কেকেএল-জেএনএফের চেয়ারম্যান আইয়াল অস্ট্রিনস্কি বলেন, পথটি বন্ধ ছিল। সেখানে শিক্ষাসফরের অনুমোদন কেন দেওয়া হয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাঁর দাবি, ইসরায়েল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব নেচারের পরিচালিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অপারেশনস রুমকে আগেই জানানো হয়েছিল যে এলাকাটি বন্ধ।

অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, শিক্ষাসফরের জন্য অনুমোদিত পথটি কোনো নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে ছিল না। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলটি হয়তো নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়েছিল।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সফরের অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বা অবিস্ফোরিত অস্ত্র স্পর্শ না করা এবং এ ধরনের কোনো বস্তু দেখতে পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশনাও ছিল।

অবিস্ফোরিত অস্ত্রের ঝুঁকি কাটছে না

ইসরায়েলে অবিস্ফোরিত অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা এখনো অজানা। বিশেষ করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত বনাঞ্চল ও কৃষিজমিতে এসব অস্ত্রের উপস্থিতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সীমিত পরিসরে অপসারণ কার্যক্রম এবং দীর্ঘদিন মাটির নিচে পড়ে থাকার কারণে অনেক বিস্ফোরক সহজে শনাক্ত করা যায় না।

ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষ, পর্যটক, শিক্ষার্থী ও কৃষিশ্রমিকদের জন্য বিপদ থেকেই যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, সংঘাত থেমে গেলেও অবিস্ফোরিত অস্ত্রের হুমকি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।

সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

আরও পড়ুন