রপ্তানি বাড়াতে মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে ভারতের জোর
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধি ভারতের রপ্তানিতে চাপ তৈরি করলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব সীমিত থাকতে পারে
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ করছে ভারত। এসব চুক্তির ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অতিরিক্ত ১৪০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হতে পারে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে এই হার ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। শুল্ক বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ নতুন বাণিজ্য চুক্তি করছে বা পুরোনো চুক্তি সম্প্রসারণ করছে। ভারতও এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ফলে ভারতের রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন খাতে সংস্কার এবং কৃষিশ্রমিকদের উৎপাদন ও সেবা খাতে কাজের সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।
মার্কিন শুল্কের প্রভাব সামলে উঠতে পারে ভারত
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধি ভারতের রপ্তানিতে চাপ তৈরি করলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ করে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে ভারতের।
একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মডেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা ভারতীয় পণ্যের ওপর গড় শুল্কহার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এর ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমতে পারে।
তবে ভারতের মোট উৎপাদনের ২ শতাংশেরও কম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাই অন্য দেশে রপ্তানি বাড়িয়ে এই ক্ষতি সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম।
ভারতের মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলো কীভাবে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, তা তিনটি বিষয়ের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো, শুল্ক কমানো, বাণিজ্য বাধা হ্রাস এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো।
প্রথমত, প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, ভারতের বাণিজ্যিক অংশীদাররা প্রথম বছরেই ভারতীয় পণ্যের ওপর সব শুল্ক তুলে নেবে। ভারতও শিল্পপণ্যের ওপর শুল্ক বাতিল করবে। কৃষিপণ্যের শুল্ক অর্ধেক কমানো হবে, এর অর্ধেক প্রথম বছরে এবং বাকি অংশ পরবর্তী ১০ বছরে কার্যকর হবে।
দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য বাধা কমানো। আগামী ১৫ বছরে পণ্য ও পরিষেবা খাতের অশুল্ক বাধাজনিত ব্যয় ধাপে ধাপে ২৫ শতাংশ কমবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। চুক্তির ফলে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কমলে পরিষেবা খাতেও অতিরিক্ত সুবিধা মিলতে পারে।
তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়লে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে।
ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার (ইএফটিএ) সঙ্গে চুক্তির আওতায় ১৫ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ হতে পারে। নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই অতিরিক্ত বিনিয়োগ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে ভারত।
চলমান ও পরিকল্পিত সব চুক্তি কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় ১৭০ বিলিয়ন ডলার বা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির আওতায় কিছু পণ্যের শুল্ক কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মোট শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামতে পারে। তবে বেশিরভাগ আওতাভুক্ত পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ ধাতব শুল্ক এবং ১০ শতাংশ ধারা ৩০১-এর শুল্ক বহাল থাকবে। এই চুক্তির লক্ষ্য দুই দেশের বাণিজ্যিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা কমানো।
ইতোমধ্যে কার্যকর মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলোর ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে এই হার বেড়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। এতে অর্থনীতিতে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে। পাশাপাশি ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ ও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা সফল হলে প্রবৃদ্ধি আরো বাড়তে পারে।
সব চুক্তি কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের রপ্তানি বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। এতে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি পণ্য ও পরিষেবা পাবে এবং ভারতের উৎপাদকদের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তবে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করলেই এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। এসব চুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভারতকে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের গতি ধরে রাখতে হবে।
চুক্তিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি, ভারতের বিশাল শ্রমশক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে পারলেও অর্থনীতির অগ্রগতি ত্বরান্বিত হতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুফল আরও বাড়বে এবং ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হবে। উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষিশ্রমিকদের উৎপাদন ও সেবা খাতে যুক্ত করতে পারলে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে। মুক্তবাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি এসব সংস্কার কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের রপ্তানি ও মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ
ভারত করপোরেট কর কমানো, ভর্তুকি দেওয়া, অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে উৎপাদন খরচ কমতে পারে। মডেল অনুযায়ী, উৎপাদন খরচ প্রায় ২ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে।
কৃষিশ্রমিকদের উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করা
ভারতের ৪০ শতাংশের বেশি কর্মী কৃষিতে নিয়োজিত। গত এক দশকে এই হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে, দ্রুত শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামে কৃষিশ্রমিকের হার ৪০ শতাংশের বেশি থেকে কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দেশটিতে মাথাপিছু কৃষি উৎপাদন বেড়ে ভারতের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি হয়েছে। ভারতেও ধাপে ধাপে কৃষিশ্রমিকদের উৎপাদন ও সেবা খাতে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
এতে ২০৩৫ সালের মধ্যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে শিল্পোন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সমন্বয় করতে পারলে ভারত দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন গতি পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি বাধা তৈরি করলেও সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত এই পরিস্থিতিকে উন্নয়নের সুযোগে পরিণত করতে পারে।