যে কৌশলে বন্যপ্রাণী রক্ষায় সাফল্য পেল ভারত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০০ এএম
সংরক্ষণ উদ্যোগে ভারতে বেড়েছে বাঘের সংখ্যা। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সম্প্রতি বাঘ, চিতাবাঘ এবং হাতির হামলায় মানুষের মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। ঘনঘন ঘটা এই দুর্ঘটনাগুলোকে অনেকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলেও, বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের এই ক্রমবর্ধমান সংঘাতের পেছনে লুকিয়ে আছে ভারতের একটি ঐতিহাসিক পরিবেশগত সাফল্য। ভারত বন্যপ্রাণী রক্ষায় নজিরবিহীন সফল হওয়ার কারণেই মানুষ ও বন্যপ্রাণী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মুখোমুখি হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভারতের জাতীয় প্রাণী বাঘ। ১৯৭০-এর দশকে বিলুপ্তির মুখে থাকা বাঘের সংখ্যা গত দুই দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০-এ পৌঁছেছে। যেখানে মালয়েশিয়ার মতো ধনী ও কম জনঘনত্বের দেশে বাঘের সংখ্যা কমছে, সেখানে ভারতের এই সাফল্য এতটাই ঈর্ষণীয় যে তারা এখন কম্বোডিয়াতেও বাঘ রপ্তানি করতে যাচ্ছে। ১৯৭৩ সালে শুরু হওয়া ভারতের ‘প্রজেক্ট টাইগার’ আজ বিশ্বজুড়ে এক সফলতার নাম।
বাঘের পাশাপাশি গুজরাটে এশীয় সিংহ এবং আসামে একশৃঙ্গ গন্ডার সংরক্ষণেও বড় সাফল্য এসেছে। আসামের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে এখন গন্ডার শিকারের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এই আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে ২০২২ সাল থেকে আফ্রিকা থেকে চিতা এনে ১৯৫২ সালে বিলুপ্ত হওয়া চিতা প্রজাতিকে ভারতে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। শুধু বাঘ বা সিংহ নয়, মৃতদেহভোজী শকুনের মতো পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীদের সংখ্যা বাড়াতেও বিশেষ প্রকল্প চলছে।
ভারতে বন্যপ্রাণী সুরক্ষার পেছনে সে দেশের জনমত ও ধর্মীয় সংস্কৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে। বৃহত্তর ভারতীয় সমাজে প্রাণী হত্যা বা নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। ফলে এশিয়ার সবচেয়ে কঠোর বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনগুলোর কিছু রয়েছে ভারতেই।
পোলিও নির্মূল এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় দ্রুত টিকা দেওয়ার মতো ভারত বন্যপ্রাণী সংরক্ষক নীতিতেও ‘মিশন মোড’ (নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও বিশেষ কর্মপরিকল্পনা) পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। ‘প্রজেক্ট টাইগার’-এর পথ ধরে পরবর্তীতে ‘প্রজেক্ট এলিফ্যান্ট’, ‘প্রজেক্ট স্নো লেপার্ড’, ‘প্রজেক্ট ডলফিন’ ও ‘প্রজেক্ট রাইনো’র মতো প্রকল্প সফল হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে কাঠ সংগ্রহের জন্য তৈরি হওয়া ‘ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট সার্ভিস’ স্বাধীনতার পর বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নিয়োজিত করা হয়। পাশাপাশি পরিবেশবাদী এনজিও, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সমন্বিত নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের এই কাজে শক্ত নজরদারি রাখছে।
অবশ্য এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা পুরোপুরি নিখুঁত নয়। বন্যপ্রাণীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত এক মারাত্মক রূপ নিয়েছে, যা এখন ভারতের নতুন প্রশাসনিক ও মানবিক সমস্যা।
তবুও, সীমিত সম্পদের একটি উন্নয়নশীল দেশ হয়েও ভারত যেভাবে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে, তা এক অনন্য অর্জন। পরিবেশবিদদের মতে, এই মডেল প্রমাণ করে যে ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দেশের দূষিত বায়ু, দমবন্ধ করা নদী কিংবা আবর্জনার ভাগাড়ের মতো জলবায়ু সংকটও দূর করা সম্ভব। কারণ মানুষ ও প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আজ বাঘ, সিংহ আর হাতির বেঁচে থাকার জন্যও পরিষ্কার বাতাস ও পানির কোনো বিকল্প নেই।