জাতিসংঘের আপত্তি উপেক্ষা করে মিয়ানমার ফিরলো ১৫০০ অভিবাসী
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
ছবি: মালয়েশিয়া থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত নিজ দেশে ফিরেছেন প্রায় দেড় হাজার মিয়ানমারের অভিবাসী। সংগৃহীত
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র আপত্তি ও সতর্কতা উপেক্ষা করে মালয়েশিয়া থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত নিজ দেশে ফিরেছেন প্রায় দেড় হাজার মিয়ানমারের অভিবাসী। অধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, চরম নিরাপত্তাঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই রবিবার (৪ অক্টোবর) এসব অভিবাসী নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি’র খবরে জানানো হয়েছে, মিয়ানমার নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজে করে ফেরত পাঠানো ১ হাজার ৪৭৬ জন অভিবাসী রবিবার ভোরে থানলিন নৌ ঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখান থেকে কয়েক ডজন অভিবাসীকে বাসে করে অভিবাসন প্রক্রিয়া ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি বৌদ্ধ মঠের হলঘরে নিয়ে যাওয়া হয়।
মালয়েশিয়ার গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ফেরত আসাদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষ। তবে তাদের মধ্যে ২৭ জন শিশু এবং ৭৯ জন নারীও রয়েছেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ঘোষণা অনুযায়ী, মিয়ানমার যে ৫ হাজার অভিবাসীকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে, এটি তাদের প্রথম দল।
মালয়েশিয়া সরকারের দাবি, আটককেন্দ্রে থাকা এই অভিবাসীরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে সম্মত হয়েছেন। তবে জাতিসংঘ ও একাধিক মানবাধিকার সংস্থা বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, মালয়েশিয়ার ডিটেনশন সেন্টারগুলোর ভয়াবহ পরিস্থিতি ও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অভিবাসীদের সামনে দেশে ফেরা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।
মালয়েশিয়ায় কফির দোকানে কাজ করা ৫৩ বছর বয়সী কিয়াও সোয়ার থেইন দীর্ঘ ১ বছর ৮ মাস আটক থাকার পর মিয়ানমারে ফিরেছেন। বৌদ্ধ মঠের হলঘরে মেঝেতে বসে তিনি বলেন, ‘আটক থাকা অবস্থায় আমি খোস পাঁচড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হই। দেশে ফিরতে চাওয়ার এটি অন্যতম কারণ। তবে এখানে আমার কোনো ভবিষ্যৎ বা আশা নেই।’
এদিকে নৌঘাঁটির বাইরে স্বজনদের অপেক্ষায় জড়ো হওয়া শত শত পরিবারের চোখে-মুখে ছিল চরম উদ্বেগ। ৫৫ বছর বয়সী কিয়াও মিন্ট জানান, মালয়েশিয়ায় এক বছরের বেশি সময় ধরে আটকে থাকা তাঁর তিন নাতি-নাতনি এই দলে ফিরেছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনী কিংবা কোনো জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর দ্বারা জোরপূর্বক যুদ্ধে নিয়োগ হতে পারে বলে তিনি শঙ্কিত।
ফেরত পাঠানোদের মধ্যে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কেউ রয়েছেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সালের সামরিক দমন-পীড়নের পর রোহিঙ্গারা ব্যাপকভাবে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেয় এবং দেশটির শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই রোহিঙ্গা।
মালয়েশিয়ায় শরণার্থীদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা স্থানীয় ক্ষোভ ও বিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে দেশটির সরকার গত জুলাইয়ে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করে। তবে ফেরত পাঠানো এই জাহাজে ঠিক কতজন রোহিঙ্গা ছিলেন, সে বিষয়ে কুয়ালালামপুর প্রশাসন কোনো স্পষ্ট তথ্য দেয়নি।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। দেশের এই উত্তাল পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কোনো পরিবেশ নেই বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘‘মিয়ানমারে যেভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন চলছে, তাতে কাউকে সেখানে জোর করে ফেরত পাঠানোর এটি কোনো উপযুক্ত সময় নয়।’’
তা সত্ত্বেও মালয়েশিয়া প্রশাসন ইতোমধ্যে আরও ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি অভিবাসীর দ্বিতীয় একটি দলকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যাদের তারা আর্থিক ও নিরাপত্তাজনিত ‘বোঝা’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে।