মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার অভিযোগ, টেলিনরের বিরুদ্ধে নরওয়েতে তদন্ত
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম
ছবি: এআই দিয়ে বানানো।
মিয়ানমারে সামরিক শাসন চলাকালে গ্রাহকদের তথ্য হস্তান্তর ও নজরদারি নিয়ে নরওয়ের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান টেলিনরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রতিষ্ঠানটির অসলো সদর দপ্তরে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তদন্তের অংশ হিসেবে অসলোতে টেলিনরের সদর দপ্তরে তল্লাশি চালিয়েছে নরওয়ের ন্যাশনাল ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন সার্ভিস ও দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা পিএসটি।
সামরিক সরকারকে গ্রাহকের তথ্য দেওয়ার অভিযোগ
নরওয়ের কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে টেলিনরের কার্যক্রম চলাকালে প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় ইউনিট একাধিকবার গ্রাহকদের পুরোনো টেলিযোগাযোগ-সংক্রান্ত তথ্য সামরিক সরকারের কাছে হস্তান্তর করে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, একই সময়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বেসামরিক জনগণের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন চালাচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে গ্রাহকদের তথ্য হস্তান্তর মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার পর্যায়ে পড়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।
তদন্তে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থান থেকে ২০২২ সালের মার্চে টেলিনর মিয়ানমারে তাদের ব্যবসা বিক্রি করে দেশটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়কাল বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
‘বাস্তবে কোনো বিকল্প ছিল না’: টেলিনর
টেলিনর বলছে, মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সামরিক বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করলে মিয়ানমারে কর্মরত তাদের কর্মীদের কারাদণ্ড, নির্যাতন এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে পড়তে হতো। কর্মীদের জীবন বিপন্ন না করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
টেলিনর জানিয়েছে, তারা নরওয়ের তদন্তকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করছে এবং তদন্তে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেবে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়নি বা তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক বিরোধীদের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ
টেলিনরের মিয়ানমার কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের শুরুতে একটি সুইডিশ অলাভজনক সংগঠন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একটি শ্রেণিগত মামলা করে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, টেলিনর মিয়ানমার সামরিক জান্তার সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিরোধীদের কল রেকর্ড ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেছিল। এসব তথ্যের কারণে অন্তত একজন পরিচিত রাজনৈতিক কর্মী মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়েছেন বলেও মামলায় দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
নজরদারি সরঞ্জাম নিয়েও তদন্ত
টেলিনরের বিরুদ্ধে তদন্তের আরেকটি বিষয় হলো মিয়ানমার থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সময় নজরদারি সরঞ্জাম হস্তান্তর।
নরওয়ের পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে ব্যবসা বিক্রির সময় টেলিনর এমন কিছু ‘নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নজরদারি সরঞ্জাম’ হস্তান্তর করেছিল, যেগুলোর লেনদেনের জন্য নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি প্রয়োজন ছিল।
এই অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না এবং ওই লেনদেন নরওয়ের নিষেধাজ্ঞা আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।
টেলিনর ২০২১ সালেই জানিয়েছিল, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে নজরদারি সরঞ্জাম সক্রিয় করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিল, এ ধরনের সরঞ্জাম সক্রিয় করা নরওয়ে ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ব্যবসা বিক্রি করে মিয়ানমার ছাড়ে টেলিনর
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে টেলিনরের কার্যক্রম ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। পরে প্রতিষ্ঠানটি দেশটিতে তাদের ব্যবসা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০২২ সালের মার্চে মিয়ানমার থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায়।
টেলিনরের ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর চাপ, কর্মীদের নিরাপত্তা এবং নজরদারি-সংক্রান্ত নির্দেশনার কারণে সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।
মানবাধিকার সংগঠনের স্বাগত
টেলিনরের বিরুদ্ধে নরওয়ের তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরোধী সংগঠন জাস্টিস ফর মিয়ানমার।
সংগঠনটির মুখপাত্র ইয়াদানার মং বলেন, মিয়ানমারে টেলিনরের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু হওয়াকে তারা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সংগঠনটি ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টসের নরওয়ে শাখার সঙ্গে কাজ করে নরওয়ের তদন্তকারীদের কাছে অভিযোগসংক্রান্ত নথি জমা দিয়েছে।
জাস্টিস ফর মিয়ানমারের দাবি, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংযোগ থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে নজরদারি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সামরিক জান্তার সঙ্গে সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি তাদের জমা দেওয়া নথিতে তুলে ধরা হয়েছে।
সংগঠনটির ভাষ্য, তদন্তের মাধ্যমে মিয়ানমারের জনগণের ওপর কথিত ক্ষতির জন্য দায় নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আইনি জটিলতায় টেলিনরের মিয়ানমার অধ্যায়
মিয়ানমারে টেলিনরের কার্যক্রম নিয়ে নরওয়ের এই তদন্ত আন্তর্জাতিক ব্যবসা, মানবাধিকার এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারের সঙ্গে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের জটিলতা সামনে এনেছে।
একদিকে টেলিনরের দাবি, সামরিক সরকারের নির্দেশ অমান্য করলে কর্মীদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ত। অন্যদিকে তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ওই পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের তথ্য হস্তান্তর ও নজরদারি সরঞ্জাম স্থানান্তরের মাধ্যমে টেলিনর মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা করেছে কি না এবং নিষেধাজ্ঞা আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না।
তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে টেলিনরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর আইনি পরিণতি। আপাতত নরওয়ের কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং টেলিনর জানিয়েছে, তারা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
সূত্র: রয়টার্স
