EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি, ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব পড়বে?

ইয়েমেনে হুথিদের বিদ্যুৎগতির অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে ইরানের প্রভাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি, ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব পড়বে?

ইয়েমেনের তিহামাহ উপকূলে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে হুথি বিদ্রোহীরা। ছবি: এপি

অ অ

ইয়েমেনের উপকূলীয় সমতলভূমি তিহামাহর দক্ষিণাংশে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা বেশিরভাগ পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত এই বিদ্রোহীরা দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলরেখার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) দখল করেছে।

সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত হুথিবিরোধী জোট ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স’ ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে উল্লেখযোগ্য এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই এর বড় অংশ চলে গেছে হুথিদের দখলে।

গত ১২ বছরের গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের বিমান হামলা এবং মার্কিন, ইসরায়েলি ও ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণ সত্ত্বেও হুথিরা যে এখনও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে, এটি তারই প্রমাণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কয়েক বছরের মধ্যে গোষ্ঠীটির সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, প্রতিপক্ষ যখন হতভম্ব ও মনোবলহীন, তখন অদূর ভবিষ্যতে হুথিদের সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তিনি বলেন, এখন হুথিরা নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করবে, আর তাদের সরাতে খরচও অনেক বেশি হবে।

হুথিরা একা নয় বলেও মন্তব্য করেন আল-ওমেইসি। তিনি বলেন, ইয়েমেনের হুথিরা ইরানের সমর্থন পেয়ে থাকে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পরাজয়ের পর তেহরানের জন্য এই সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ইরান হুথিদের প্রতি নিজেদের সমর্থন আবারও নিশ্চিত করেছে।

বেশিরভাগ বিশ্লেষক একমত যে হুথিদের কেবল ইরানের পুতুল হিসেবে দেখা ভুল হবে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি নতুন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ হামলা চালানোর সাত মাস পর তেহরান এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করছে। এর একটি পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি, অন্যটি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব।

লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষণা ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, এখন ইরান সরাসরি এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ও বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত দুটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশেরও বেশি এই দুই পথ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। তার মতে, এর প্রভাব পারমাণবিক বোমার বিপর্যয়ের সমপর্যায়ের হতে পারে।

হুথিরা লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে, যার মধ্যে আছে পেরিম দ্বীপ। এটি বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের মাঝখানে অবস্থিত। ফলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা তাদের অনেক বেড়ে যাবে। ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেগ বিবিসি রেডিও ৪-কে বলেন, ভৌগোলিক এই অগ্রগতি ছাড়াই হুথিরা বাব আল-মান্দাব দিয়ে যাওয়া-আসা করা জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল, এখন এই এলাকা দখলে থাকায় তাদের প্রভাব আরও বাড়বে।

শুক্রবার বিকেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক বাহিনী জানায়, সৌদি আরবের নয় এমন কোম্পানির জাহাজের জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ। তবে সৌদি জাহাজ আগে থেকেই তাদের অবরোধের আওতায় রয়েছে। হুথিরা আগেও বলেছিল, তারা কেবল ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালায়। কিন্তু বাস্তবে তারা এমন জাহাজেও হামলা চালিয়েছে যার সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সম্পর্ক ছিল না, যার একটি ছিল নরওয়েজীয় পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ। ফলে হুথিদের এই বক্তব্যের আন্তরিকতা নিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক।

তবে ক্রেগ মনে করেন, হুথিরা এবার হয়তো নির্বিচার হামলা এড়িয়ে চলবে। কারণ, ২০২৫ সালের বসন্তে ছয় সপ্তাহের বড় মার্কিন বিমান ও নৌ হামলা ‘অপারেশন রাফ রাইডার’-এর পুনরাবৃত্তি তারা চাইবে না। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের কড়া প্রতিক্রিয়া তারা ইতিমধ্যে অনুভব করেছে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যুক্তরাষ্ট্র কি আবার এই সংঘাতে জড়াতে চাইবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তেলের দাম আবার বাড়তে থাকায় নতুন সংঘাত তার জনসমর্থন বা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করবে না। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের হস্তক্ষেপের অনুরোধেও এখনো সাড়া দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। অ্যাক্সিওস লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন, সৌদি আরবকে সমর্থন দিতে চাইলেও সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা এড়াতে চাইছে তারা।

সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু বাব আল-মান্দাব নিয়ে নয়। স্যাটেলাইট চিত্র বলছে, দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও হুথিদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে তেল রপ্তানির এই বিকল্প রুটই সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এর মাধ্যমে ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে চাইছে।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক বারাআ শাইবান বলেন, ২০২২ সালের জাতিসংঘ-মধ্যস্থতাকৃত যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় এই সংঘাত বৃদ্ধির শুরু হয় জুলাই মাসে, যখন হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে ফিরে আসে। তার ভাষায়, এরপর থেকেই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে এবং লোহিত সাগরে আরও বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ইরান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইয়েমেন যখন আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, সৌদি আরব যখন লোহিত সাগরে নিজের অর্থনৈতিক জীবনরেখা রক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর ট্রাম্প যখন এই সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী, তখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক এক মাত্রা পেয়েছে। আর ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত, ক্ষুধার্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে।

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন