EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

নেপালে হিমবাহ হ্রদ বিপর্যয় ঠেকাতে নতুন প্রকল্প, তবু শঙ্কা

ভয়াবহ হিমবাহ বন্যার পর ঝুঁকিপূর্ণ চার হ্রদের পানি কমাতে নতুন প্রকল্প নিলেও তা যথেষ্ট নয় বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম

নেপালে হিমবাহ হ্রদ বিপর্যয় ঠেকাতে নতুন প্রকল্প, তবু শঙ্কা

হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকি কমাতে নেপালের চারটি হ্রদের পানি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

অ অ

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস হয়। এই ঘটনার পর ঝুঁকিপূর্ণ চারটি হিমবাহ হ্রদের পানির স্তর কমাতে নতুন প্রকল্প নিয়েছে নেপাল সরকার। প্রকল্পটির নাম ‘গ্লফ সঞ্জীবনী প্রকল্প’। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ (ডিএইচএম) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে। কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানান, ২৬ আগস্ট নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে হিমবাহের একাংশ ভেঙে পড়ে। বরফের ওই অংশ প্রায় ৪ হাজার ফুট নিচে পড়ে পাহাড়ের ঢাল ক্ষয় করে দ্রুত নেমে আসে। চীনা ভূতত্ত্ববিদের হিসাবে, ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার গতিতে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষের স্রোত সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও একের পর এক গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

হিমালয় রেঞ্জে এমন হিমবাহ ধস নতুন কিছু নয়। ২০১২ সালে অন্নপূর্ণা-৪ থেকে বরফ-পাথর ধসে একই ধরনের বন্যা হয়েছিল। ২০২৩ সালে ভারতের সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদ বিস্ফোরিত হয়েও আকস্মিক বন্যা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের হিমবাহ হ্রদ ভাঙলে শুধু নেপাল নয়, ভাটিতে থাকা ভারত ও বাংলাদেশও ঝুঁকিতে পড়ে।

২০২০ সালে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) ও ইউএনডিপির যৌথ গবেষণায় নেপালের ৪৭টি হিমবাহ হ্রদকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ২১টি নেপালের সীমানায়। নেপালে মোট হিমবাহ হ্রদ রয়েছে ২ হাজারের বেশি। এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি হ্রদের পানি কমানো হয়েছে—২০০০ সালে থো রোলপা ও ২০১৬ সালে ইমজা।

নতুন প্রকল্পে ভোতেকোশি ও গণ্ডকী অববাহিকার সোলুখুম্বুর লুমডিং সো, হোঙ্গু-২, সংকুয়াসভার লোয়ার বারুন ও মানাংয়ের থুলাগি হ্রদের পানি কমানো হবে। প্রকল্পের ব্যয় ৫ কোটি ডলার, যার মধ্যে জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) দেবে ৩ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। বাকি অর্থ জোগাড় করবে নেপাল সরকার ও অংশীদার সংস্থাগুলো। এতে পাহাড়ি এলাকার প্রায় ২৩ লাখ মানুষ উপকৃত হবে বলে জানিয়েছে ডিএইচএম।

প্রকল্পের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক রাজন ভট্টরাই বলেন, এ বছর নির্মাণকাজ শুরু হবে না, চলবে নকশা চূড়ান্ত করা, পরামর্শক নিয়োগ ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের কাজ। পানির স্তর কতটা কমানো হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, থো রোলপা ও ইমজায় যে পরিমাণ পানি কমানো হয়েছিল, প্রায় ততটাই কমানো হবে—অর্থাৎ প্রায় তিন মিটার।

তবে বিশেষজ্ঞরা এই তিন মিটারের মানদণ্ড নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। মার্কিন পর্বত পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অ্যালটন সি. বায়ার্স বলেন, থো রোলপায় মূল পরিকল্পনা ছিল পানি ২০ মিটার কমানোর, কিন্তু বাজেট সংকটে তা তিন মিটারে থেমে যায়। তার মতে, এই মানদণ্ড অপর্যাপ্ত এবং বর্তমান পরিকল্পনায় ভাটির জনবসতি সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হবে না।

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিতেশ খাডকা বলেন, সামান্য পানি কমিয়ে কোটি কোটি ডলার খরচ করলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে না। ঝুঁকি কার্যকরভাবে কমাতে হলে ভাটিতে অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর মতো পরিমাণে পানি কমাতে হবে। বায়ার্স বলেন, প্রতিটি হ্রদের জন্য আলাদা গবেষণা করে প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।

তবে নেপালের ডিএইচএমের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান বিনোদ পরাজুলি বলেন, সামান্য হলেও পানি কমালে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কমে। ভৌগোলিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে এ কাজের খরচ বেশি বলেও জানান তিনি।

মার্কিন হিমবাহ বিশেষজ্ঞ জেফরি এস. কারগেল বলেন, শুধু পানি কমালেই হবে না—হ্রদ থেকে পানি বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও দরকার। ভাটিতে জনগোষ্ঠী ও অবকাঠামোর ঝুঁকি নিয়েও ভাবতে হবে এবং বন্যার সম্ভাব্য পথে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে সতর্ক হতে হবে বলে মনে করেন তিনি। নেপাল ও ভারতের কিছু এলাকায় এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতা নেওয়া হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নেপালের হিমবাহ হ্রদ বিশেষজ্ঞ রিজন ভক্ত কায়াস্থ বলেন, শুধু বড় হ্রদই বিপজ্জনক—এই ধারণা ভুল। নেপালে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদের বেশিরভাগ নিয়ে এখনো গবেষণা হয়নি এবং আরও শত শত ছোট হ্রদ ঝুঁকিপূর্ণ। হিমবাহ হ্রদের পাশাপাশি হিমবাহও একইভাবে বিপজ্জনক বলে জানান তিনি। এ কারণে তালিকাভুক্ত হ্রদের বাইরে অন্য ছোট হ্রদগুলোও মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন