কেন মিলছে না পাত্রী? ২৯ যুবকের আত্মহত্যার পর যে প্রশ্ন উঠছে ভারতে
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
ছবি: প্রতীকী
বিয়ের জন্য পাত্রী না পাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে ভারতের মহারাষ্ট্রের জলগাঁও জেলায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৯ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। মহারাষ্ট্র পুলিশের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিষয়টি সামনে আসার পর জলগাঁওয়ে বিয়ে নিয়ে সামাজিক চাপ, পুরুষদের আর্থিক সক্ষমতা এবং পরিবর্তিত পারিবারিক প্রত্যাশা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মহারাষ্ট্র পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জলগাঁও জেলায় ৩৮৩ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ২৯টি ঘটনায় বিয়ের জন্য পাত্রী না পাওয়ার বিষয়টি আত্মহত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব আত্মহত্যার পেছনে শুধু বিয়ে না হওয়াকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছে না পুলিশ। মাদকাসক্তি, হতাশা, পারিবারিক সমস্যা ও ঋণের মতো নানা বিষয়ও আত্মহত্যার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে জানানো হয়েছে।
বিয়ের বয়স নিয়ে সামাজিক চাপ
জলগাঁওয়ের ৩০ বছর বয়সী অধ্যাপক বিশাল পাতিলের ক্ষেত্রেও বিয়ে নিয়ে পরিবারের চাপ রয়েছে। তাঁর বাবা-মা চান তিনি বিয়ে করুন। কিন্তু বিশাল এখন ক্যারিয়ারে মনোযোগ দিতে এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চান।
বিশালের মতে, ভারতীয় সমাজে একটি নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিয়ে করার প্রত্যাশা রয়েছে। সাধারণত ২৪ থেকে ২৬ বছর কিংবা সর্বোচ্চ ২৮-২৯ বছরের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাওয়া উচিত—এমন ধারণা প্রচলিত। কারও বয়স ৩০ পেরিয়ে গেলে তাঁকে ভিন্নভাবে দেখার প্রবণতাও তৈরি হয়।
এমন সামাজিক চাপ অনেক সময় অবিবাহিত তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুকেশ। তাঁর মতে, বিয়ের সঙ্গে যখন সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সাফল্যকে যুক্ত করা হয়, তখন অনেক তরুণ বিয়ে না হওয়াকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
পুরুষের সংখ্যা বেশি, কিন্তু কারণ কি শুধু নারী সংকট?
মহারাষ্ট্রের পরিসংখ্যানে আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। ২০১৯-২০২১ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-৫-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটির ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ১১ শতাংশ অবিবাহিত। একই বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ, মহারাষ্ট্রে অবিবাহিত পুরুষের হার নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কিন্তু নারী-পুরুষের সংখ্যার এই পার্থক্যই বিয়ের সংকটের একমাত্র কারণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বারবার ‘না’, শেষ পরিণতি আত্মহত্যা
জলগাঁওয়ের কৌস্তুভ পোটদারের ঘটনাও বিষয়টির আরেকটি দিক সামনে আনে।
বি ফার্ম ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি নাসিকের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। মায়ের মৃত্যুর পর পরিবার তাঁর জন্য পাত্রী খোঁজা শুরু করে। কিন্তু নিজের বাড়ি বা সরকারি চাকরি না থাকায় বিভিন্ন পাত্রীপক্ষ থেকে তাঁকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে বলে জানা যায়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মহত্যা করেন কৌস্তুভ।
তবে তাঁর ঘটনাকে সব ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতির উদাহরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ঘটনাটি ইঙ্গিত করে, বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষের চাকরি, আয়, নিজস্ব বাড়ি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
‘পাকা বাড়ি বানালেই পাত্রী পাব’
জলগাঁওয়ের এক প্রবীণ নারী জানান, তাঁর ছেলের বয়স এখন ৪০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজছেন তিনি। কিন্তু বারবার পাত্রীপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এখন নিজেই একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন।
তাঁর আশা, বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে ছেলের জন্য পাত্রী পাওয়া যাবে।
এই বক্তব্যে যেমন ছেলের বিয়ে নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তেমনি বছরের পর বছর চেষ্টা করেও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় এক ধরনের অসহায়ত্বও ফুটে উঠেছে।
বদলে যাচ্ছে বিয়ের বাজার
মহারাষ্ট্রের গ্রামাঞ্চল নিয়ে গবেষণা করা ময়ূর কুডুপলে ও জোয়েল কাবালিয়ানের গবেষণাতেও বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশার বিষয়টি উঠে এসেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে বিয়ের ক্ষেত্রে নারীদের পছন্দকে প্রভাবিত করে জমি, শিক্ষা, জাতি ও পাত্রের বয়সের মতো বিষয়।
গবেষক ময়ূর কুডুপলের মতে, একসময় মেয়ের পরিবার পাত্রের কতটা জমি রয়েছে, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিত। এখন জমির চেয়ে পাত্রের চাকরি আছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাঁর মতে, গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতি বদলেছে। কিন্তু বিয়ে নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা সেই গতিতে বদলায়নি। আগে জমিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। এখন নিয়মিত আয়, কর্মসংস্থান, শহরে বসবাসের সুযোগ এবং নিজস্ব বাড়ির মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফলে জলগাঁওয়ের ২৯টি আত্মহত্যার পরিসংখ্যান শুধু পাত্রী সংকটের প্রশ্নই তুলছে না; একই সঙ্গে সামনে আনছে বিয়ে নিয়ে সামাজিক চাপ, পুরুষের আর্থিক সক্ষমতা এবং বদলে যাওয়া পারিবারিক প্রত্যাশার জটিল বাস্তবতাও।
সূত্র: বিবিসি