এক ভুল সিদ্ধান্তেই পরমাণু যুদ্ধ! কতটা ঝুঁকিতে বিশ্ব?
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
পারমাণবিক যুদ্ধের ভয় কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব থেকে? কয়েক দশক ধরে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোকে সংযত রাখা ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ এখন নানা কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভেঙে পড়ছে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পুরোনো কাঠামো। ফলে একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকেই ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো জানত, সরাসরি সংঘাতে জড়ালে উভয় পক্ষের জন্যই নেমে আসবে বিপর্যয়। একে অপরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার সক্ষমতার ভয়ই তাদের সংযত রেখেছিল। সেই পারস্পরিক ভয় ও ভারসাম্যই পরিচিতি পেয়েছিল ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ হিসেবে।
কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই ব্যবস্থার ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং এশিয়ায় সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর উত্তেজনা বাড়ছে। একই সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ছে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পুরোনো ব্যবস্থা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যদি পারমাণবিক যুদ্ধের বাস্তব ঝুঁকি নিয়ে ভয় কমে যায়, তাহলে সামরিক ও ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
একবার যদি যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তখন পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যেখানে পৃথিবী পুরোপুরি ধ্বংস হবে না এবং কোনো পক্ষও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করবে না।
সেক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্রের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধমূলক ভূমিকা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তখন এটিকে যুদ্ধের শেষ সীমার অস্ত্রের বদলে অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক হাতিয়ার হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুরু হতে পারে আরও কার্যকর ও উন্নত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ড্রোন, সাইবার প্রযুক্তি ও অন্যান্য সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ। এসব প্রযুক্তি রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে আরও কঠিন করে তুলছে। একটি দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
যুদ্ধ এখন আর শুধু রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, রাজনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে একদিকে রাষ্ট্রগুলো লড়াইয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, অন্যদিকে জমছে ক্লান্তি। আর সেই ক্লান্তি থেকেই দ্রুত সংঘাতের অবসান ঘটাতে চরম অস্ত্র ব্যবহারের প্রলোভন তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিশ্ব কি আবারও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে একটি ভুল হিসাব বা ভুল সিদ্ধান্ত ভয়াবহ পারমাণবিক সংঘাতের সূচনা করতে পারে?
বিশ্ব নিরাপত্তার পুরোনো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এখনো রয়েছে। আত্মসংযম, বাস্তব সক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন, কূটনৈতিক সংলাপ এবং নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই পারে সেই ঝুঁকি কমাতে।
কারণ পারমাণবিক যুগে সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়া নয়—একটি ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হওয়া থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা।
সূত্র: আরটি