যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা থেকে ৮৬ টন স্বর্ণ সরাল নেদারল্যান্ডস, কেন এই সিদ্ধান্ত?
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত ৮৬ টন স্বর্ণ যুক্তরাজ্যের লন্ডনে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডি নেদারল্যান্ডশে ব্যাংক (ডিএনবি)। সংকটের সময় স্বর্ণ দ্রুত ব্যবহার ও লেনদেনের সুযোগ বাড়াতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।
ডিএনবি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা মোট প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে প্রায় ৮৬ টন লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ব্যাংকের ভাষ্য, নিউইয়র্ক ও অটোয়ার তুলনায় লন্ডনে সংরক্ষিত স্বর্ণ দ্রুত কেনাবেচা করা যায়। ফলে গুরুতর সংকট দেখা দিলে সেখানকার স্বর্ণ দ্রুত কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ডিএনবির প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লিজপেন বলেন, এই স্থানান্তরের মাধ্যমে স্বর্ণের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানো হয়েছে। স্বর্ণ কখনো ব্যবহার করার প্রয়োজন নাও হতে পারে; তবে দেশের স্থিতিস্থাপকতা ও সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।
কোথায় কত স্বর্ণ থাকছে
ডিএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নেদারল্যান্ডসের মোট স্বর্ণের মজুত ছিল ৬১২ দশমিক ৪ টন। এর মূল্য ছিল প্রায় ৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো।
স্থানান্তরের আগে নেদারল্যান্ডসের মোট স্বর্ণের ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ নিউইয়র্কে এবং ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ অটোয়ায় ছিল। নতুন ব্যবস্থায় উভয় জায়গাতেই স্বর্ণের অংশ কমে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে লন্ডনে থাকা স্বর্ণের অংশ ১৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের জাইস্টে থাকা স্বর্ণের অংশ ৩০ দশমিক ৮ শতাংশই রয়েছে।
ডিএনবি বলছে, স্বর্ণ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রাখার মাধ্যমে ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়াও এই সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে লন্ডনে স্বর্ণের বড় অংশ রাখায় সংকটের সময়ে তা দ্রুত বাজারজাত বা ব্যবহার করার সুযোগ বাড়বে।
কীভাবে সরানো হলো
পুরো ৮৬ টন স্বর্ণ শারীরিকভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া হয়নি। ডিএনবি জানিয়েছে, স্থানান্তরের বড় অংশ সম্পন্ন হয়েছে স্বর্ণ বিক্রি ও পুনরায় কেনার মাধ্যমে।
প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ নিউইয়র্কে বিক্রি করে লন্ডনে আন্তর্জাতিক বাজারের মানসম্পন্ন সমপরিমাণ স্বর্ণ কেনা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ শারীরিকভাবে নেদারল্যান্ডসের জাইস্টে আনা হয়। পরে একই পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বর্ণ জাইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। এতে স্বর্ণের বার গলিয়ে নতুন করে তৈরি করার প্রয়োজন হয়নি।
ডিএনবির মতে, কেনাবেচা ও ভৌত পরিবহনের সমন্বিত পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে বড় পরিমাণ স্বর্ণ স্থানান্তরের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়েছে।
নেপথ্যে কি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে উদ্বেগ?
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেনি। বরং তারা ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কথা বলেছে এবং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করার বিষয়টি সামনে এনেছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, বাণিজ্যিক বিরোধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের স্বর্ণের অবস্থান নতুন করে পর্যালোচনা করছে। বিশেষ করে লন্ডন বিশ্বের অন্যতম বড় ভৌত স্বর্ণবাজার হওয়ায় সেখানে মজুত বাড়ানোর ফলে সংকটের সময়ে স্বর্ণ দ্রুত ব্যবহার করা সহজ হবে।
তবে এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণভাবে স্বর্ণ প্রত্যাহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্থানান্তরের পরও নেদারল্যান্ডসের মোট স্বর্ণের ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ নিউইয়র্কে এবং একই পরিমাণ অটোয়ায় সংরক্ষিত রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির স্বর্ণের মোট মজুতের পরিমাণ অবশ্য পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে মূলত কোন দেশে কতটা স্বর্ণ রাখা হচ্ছে, সেই বণ্টনে।