EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে গেছে কানাডা, কী প্রতিক্রিয়া সে দেশে?

ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে গেছে কানাডা, কী প্রতিক্রিয়া সে দেশে?
অ অ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত দাবি তুলেছে। এর বিপরীতে কানাডাকে খুব কম ছাড় দিতে চেয়েছে।

চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর পর কানাডার এমন সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিনের মিত্র দুই দেশ এরই মধ্যে বাণিজ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। এখন এ বিরোধ কোন দিকে যায়, তা নিয়ে নজর রয়েছে।

কার্নি শনিবার বলেন, কানাডা তার জাতীয় স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র শেষ মুহূর্তে শর্ত বদলে ‘ক্ষমতার খেলা’ খেলেছে।

দুই দেশ বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কার্নি বলেন, ‘আপনার ওপর হামলা হলে তবেই আপনি যুদ্ধে আছেন—আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, এ বাণিজ্য বিরোধ কানাডার ইচ্ছায় শুরু হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘কানাডা শক্তিশালী, কানাডা প্রস্তুত, কানাডা ঐক্যবদ্ধ।’

তবে এ অবস্থানের অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে কানাডাকে। দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। আবার মিশিগান, কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা ও ওহাইওর মতো কয়েকটি মার্কিন অঙ্গরাজ্যের জন্য কানাডা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে কানাডার ব্যবসা-বাণিজ্য ইতিমধ্যে চাপের মুখে। এর সঙ্গে পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে দুই দেশের অর্থনীতিতেই বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

কার্নি ক্ষমতায় আসার পর ‘এলবোস আপ’—আইস হকির এই শব্দবন্ধ সামনে এনেছিলেন। এর অর্থ আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিরোধ করা। ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক চাপ ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি।

সাম্প্রতিক জরিপে কানাডীয়দের বড় একটি অংশের কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। অ্যাবাকাস ডেটার এক জরিপে ৩৬ শতাংশ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থাকে সমর্থন করেছেন।

আর লেগারের এক জরিপে ৫৬ শতাংশ বলেছেন, ফেডারেল সরকারের উচিত কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ছাড় না দেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে কানাডীয়দের ক্ষোভের প্রভাব দেশটির ভোক্তা আচরণেও পড়েছে। অনেক কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ এড়িয়ে চলছেন। এতে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন খাতে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বা প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব কমেছে।

কানাডার অধিকাংশ প্রদেশের দোকান থেকে মার্কিন মদ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও যুক্তরাষ্ট্রের মদ শিল্পে বড় প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন সরকারের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইন রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ কমেছে। এতে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৩৫৭ মিলিয়ন ডলার।

মার্কিন ডিস্টিলড স্পিরিটস কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রাদেশিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন স্পিরিটসের রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে।

এ পরিস্থিতিতে কানাডার যেসব প্রদেশ তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত, সেসব প্রদেশের নেতাদেরও কার্নিকে বোঝাতে হবে যে আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

শনিবার প্রাদেশিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন কার্নি। আপাতত তাঁরাও সরকারের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি বলেন, জাতীয় প্রকল্পে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড বলেন, ‘আমরা এ লড়াই শুরু করিনি। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, আমরাই এ লড়াইয়ে জিতব।’

কী ভুল হয়েছিল

গত এক সপ্তাহে মনে হচ্ছিল, ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আলোচনা ভেঙে যায়।

ঠিক কী কারণে আলোচনা ভেঙেছে, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে দুই পক্ষের বক্তব্যে শেষ মুহূর্তের মতবিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে।

কার্নির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের শেষ মুহূর্তের শর্তগুলো ছিল অন্যায্য ও অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক। এসব শর্তের মধ্যে গাড়ি শিল্প নিয়ে দাবি এবং অন্য দেশের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য চুক্তির ওপর বিধিনিষেধ ছিল বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জামিসন গ্রিয়ার অভিযোগ করেছেন, কানাডা নতুন দাবি তুলেছে এবং আগে দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে।

কানাডার প্রদেশগুলো মার্কিন স্পিরিটস পণ্য দোকানে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টিও আলোচনার ভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

গত সপ্তাহে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের পর কানাডার কয়েকজন প্রাদেশিক নেতা, শিল্প সংগঠন ও রাজনৈতিক বিরোধী দল উদ্বেগ প্রকাশ করে।

তাঁদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন, কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি সেখান থেকে সরে যাচ্ছেন। তবে কার্নি বলেছেন, এসব সমালোচনা তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডও সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, চাপের মুখে করা কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে আরও ছাড় আদায়ে উৎসাহিত করবে।

কনজারভেটিভ বিরোধীদলীয় নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভরও বলেছেন, কানাডার শিল্পের ওপর একতরফা শুল্ক বহাল থাকলে সেটি ভালো চুক্তি হবে না।

শনিবার তিনি কার্নির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, কানাডা এমন একতরফা শুল্ক মেনে নিতে পারে না, যা দেশের শিল্পভিত্তিকে ধ্বংস করে দেবে।

চুক্তি ভেস্তে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চলমান পর্যালোচনা।

এখন কানাডাকে অপেক্ষা করতে হবে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সিদ্ধান্তের কী প্রতিক্রিয়া দেখান।

আরও পড়ুন