EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

সুদানের আকাশ থেকে নেমে আসে মৃত্যু

ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

সুদানের আকাশ থেকে নেমে আসে মৃত্যু
অ অ

তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত আফ্রিকার দেশ সুদান। ভ্রাতৃঘাতী এই যুদ্ধে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ, অন্তত ৪৫ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সুদানের ৩ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রায় ২ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ভেঙে পড়েছে অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড।

সব মিলিয়ে সুদান এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে নিমজ্জিত। দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি কলেরাসহ ছড়িয়ে পড়া নানা মহামারি সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে।

ভ্রাতৃঘাতী এই যুদ্ধে একদিকে আছে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বধীন সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনী সুদান সশস্ত্র বাহিনী-এসএএফ। তার প্রতিপক্ষ আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-আরএসএফ, যার নেতৃত্বে আছেন হেমেদতি নামে পরিচিত জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো। অথচ একসময় এই দুই জেনারেল ছিলেন সহযোদ্ধা।

২০১৯ সালে এক গণ-অভ্যুত্থান ও সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রায় ৩০ বছরের স্বৈরশাসক ওমর আল-বশির। সে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন এসএএফ প্রধান জেনারেল বুরহান এবং আরএসএফ প্রধান জেনারেল হেমেদতি। বশিরের পতনের পর বুরহান দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হন এবং হেমেদতি হন তার ডেপুটি। ২০২১ সালে তারা দুজনে মিলে সামরিক শাসন জারি করেন।

এক লাখ সদস্যের আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নে তাদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দেয়। বুরহান চাচ্ছিলেন ২ বছরের মধ্যে একত্রীকরণ সেরে ফেলতে। আর হেমেদতির চাওয়া ছিল ১০ বছর।

একত্রীকরণের পর কে বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন, তা নিয়েও শুরু হয় দ্বন্দ্ব। কেউ কাউকে ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। উত্তেজনার এক পর্যায়ে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সকালে খার্তুমের একটি সামরিক ঘাঁটিতে শুরু হয় সংঘর্ষ, দ্রুত তা রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ সমঝোতার নানা উদ্যোগ নিয়েও থামাতে পারেনি এই যুদ্ধ। বরং যত দিন যাচ্ছে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নতুন নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামছে দুই পক্ষই।

যুদ্ধটা শুরুতে স্থলেই সীমাবদ্ধ ছিল। ক্রমেই তা আকাশেও ছড়িয়ে গেছে। ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, যুদ্ধকে আরো অনিশ্চিত, আরো প্রাণঘাতী করে তুলেছে। ড্রোনের বহুল ব্যবহার সুদান গৃহযুদ্ধের ছন্দই বদলে দিয়েছে।

আগে বর্ষাকালে যুদ্ধ প্রায়শই মন্থর হয়ে পড়ত। কারণ বন্যায় রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় সৈন্য, ভারী অস্ত্র এবং রসদ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ত। তবে আবহাওয়ার কারণে স্থলবাহিনী থমকে গেলেও ড্রোনগুলো সচল থাকতে পারে। চলাচলের জন্য ড্রোনকে রাস্তার ওপর নির্ভর করতে হয় না, এরা অসুস্থ হয় না, কাদার মধ্যেও আটকে যায় না।

ড্রোন যেমন যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে, তেমনি এটি যুদ্ধকে বেসামরিক জীবনের আরো গভীরে নিয়ে গেছে। সুদান গৃহযুদ্ধে এখন আর ফ্রন্ট লাইন বলে কিছু নেই। ঘরবাড়ি, বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন ক্রমশ ড্রোনের আঘাতের সীমানার মধ্যে চলে আসছে। ফলে গোটা সুদানই হয়ে উঠছে এক উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্র।

বর্তমানে বিদেশে তৈরি ড্রোনের সরবরাহ বাড়তে থাকায় জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, এই সংঘাত আরো একটি নতুন ও মারাত্মক ধাপে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ড্রোন হামলায় অন্তত ৮৮০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আফ্রিকা ডিফেন্স ফোরাম-এডিএফ’ জানিয়েছে, তুরস্কের সরবরাহ করা ড্রোন এসএএফকে শক্তিশালী করেছে। তুরস্কের বানানো ড্রোন দীর্ঘ সময় উড়তে পারে, বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং খরচও তুলনামূলক কম। তুরস্ক জানিয়েছে যে তারা সুদানের সার্বভৌমত্ব ও শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।

জবাবে আরএসএফ-ও তাদের ড্রোন কার্যক্রম বাড়িয়েছে। তারা চীনে তৈরি দূরপাল্লার ড্রোন পাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অবশ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে ড্রোন দেয়ার কথা অস্বীকার করেছে।

প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রকাশনা ‘মিলিটারি আফ্রিকা’ জানিয়েছে যে, তুর্কি ড্রোন আরএসএফ-এর পক্ষেও দেখা গেছে, ফলে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো নির্দিষ্ট হামলার জন্য কারা দায়ী তা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সুদানের আরো অনেক শহরের মত অবরুদ্ধ আল-উবাইদের মানুষের জীবনে ড্রোন এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা, যেখানে জীবনযাত্রার সবচেয়ে সাধারণ নিয়মগুলোর মধ্যেও লুকিয়ে থাকে আকস্মিক মৃত্যুর আতঙ্ক।

গত জুনে ৪২ বছর বয়সী পয়োনিষ্কাশন ট্রাকচালক আহমাদো একটি পানির ট্রাক স্টেশনে কাজ করছিলেন। আকস্মিক ড্রোন হামলায় স্কুল শেষে তার সঙ্গে দেখা করতে আসা তার ৯ বছরের ছেলে এবং দুই সহকর্মী মারা যান।

আহমাদো বলেন, ‘আমার দিনটি অন্য যেকোনো দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। আমাদের মাথার ওপর ড্রোন উড়ছিল, কিন্তু আমি কখনোই ভাবিনি যে আমার সন্তান বা আমি এর লক্ষ্যবস্তু হবো।’

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ‘আফ্রিকা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর নিরাপত্তা বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক নেট অ্যালেনের মতে, ড্রোন সুদানের যুদ্ধক্ষেত্রকে নতুন রূপ দিয়েছে এবং এটি প্রক্সি যুদ্ধের ভবিষ্যতের একটি রূপরেখা দেখাচ্ছে।’

আল-উবাইদ এবং সমগ্র সুদানজুড়ে বাসিন্দারা বলছেন যে মাথার ওপর ড্রোনের আওয়াজ এখন তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল-উবাইদে এই পরিস্থিতির অবনতি বিশেষভাবে তীব্র রূপ নিয়েছে। গত ১৮ মাস ধরে এসএএফ’এর নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও শহরটি এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যাকে জাতিসংঘ ‘অবরোধের মতো পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

উত্তর কর্দোফানের রাজধানী হিসেবে আল-উবাইদ এমন কিছু প্রধান সড়কের ওপর অবস্থিত, যা খার্তুমের সঙ্গে দারফুর, বৃহত্তর কর্দোফান অঞ্চল এবং সুদানের দক্ষিণাঞ্চলকে যুক্ত করেছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শহরটি দুই পক্ষের জন্যই কৌশলগত লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক জানান, কেবল জুন মাসেই তার কার্যালয় শহর ও এর আশেপাশে ১৫টি ড্রোন হামলা নিশ্চিত করেছে, যাতে অন্তত ৪৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন যে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা সম্ভবত এর চেয়ে অনেক বেশি। ক্রমবধমান ড্রোন হামলা ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজকেও আরো কঠিন করে তুলেছে। এই মাসের শুরুর দিকে, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য ৫০ টন ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যাওয়া জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার একটি ট্রাকে ড্রোন আঘাত হানে। সংস্থার মতে, চলতি বছরে এটি জাতিসংঘের ত্রাণবাহী ট্রাকে ড্রোন হামলার দ্বিতীয় ঘটনা।

সুদানে নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের কান্ট্রি ডিরেক্টর শাশ্বত সরাফ বলেন, ‘আল-উবাইদের পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের, হাত-পা এবং ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। কোনো কিছুই রেহাই পাচ্ছে না এবং যারা এই হামলা থেকে বেঁচে ফিরছে, তারা অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, তাদের আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’

২৭ বছর বয়সী যুবক এল সাদিক এর আগেও তিনবার ড্রোন হামলা থেকে বেঁচেছেন। কিন্তু গত জুনে চতুর্থ হামলায় উড়ে গেছে তার বাম পা। এল সাদিক বলেন, ‘ড্রোনের হামলা থেকে আপনি লুকিয়ে থাকতে পারবেন না। যখন আমরা শুনি যে আকাশে ড্রোন আছে, তখন আমরা কোনো কংক্রিটের ভবনের নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এটি হঠাৎ করেই চলে আসে, আমরা জানি না কখন বা কোথায় এটি আঘাত হানবে।’

এল সাদিকের জন্য এখন বাইরে বের হওয়া মানেই চরম আতঙ্ক। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন বাইরে যান, তখন জানেন না যে আপনি আর ফিরে আসতে পারবেন কিনা। হয়তো আপনি কোথাও বসে আছেন, আর হঠাৎ করেই আপনার পাশে একটি ড্রোন এসে পড়ল। আপনি বেঁচেও থাকতে পারেন, আবার মারাও যেতে পারেন। আপনি কিছুই জানেন না।’

আরও পড়ুন