ছবি: সংগৃহীত
ইসরাইলের অভ্যন্তরে আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই অভাবিত হামলা দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক মহলকে পুরোপুরি হতভম্ব করে দিয়েছে। তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে সাইরেন বাজার পর হাসপাতালগুলো থেকে নবজাতকদের ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে এবং স্কুল-কলেজ ও গণজমায়েত বাতিল করা হয়েছে।
ইসরাইলের ‘চ্যানেল থার্টিন নিউজ’- এর সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড জানিয়েছেন, এই হামলা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। ইসরাইল-মার্কিন যৌথ অভিযানের পর তেল আবিবের ধারণা ছিল, ইরান আর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সাহস দেখাবে না। কিন্তু রোববার (৭ জুন) বৈরুতের দক্ষিণে ইসরাইলি বিমান হামলায় দুই লেবানিজ নাগরিক নিহত হওয়ার পর ইরান এটিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে পাল্টা আঘাত হানে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইল তেহরানসহ বিভিন্ন ইরানি শহরে বিমান হামলা চালালে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে মোড় নেয়।
সোমবারও (৮ জুন) দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি অব্যাহত ছিল। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের এই পদক্ষেপকে ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের ‘কৌশলগত বিপর্যয়’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস)- এর ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, চলতি বছরের শুরুতে পরিচালিত ইরানবিরোধী যৌথ সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
তার মতে, ইসরাইল এখন এক মারাত্মক উভয়সংকটে পড়েছে— হয় ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে হবে, অথবা লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত করতে হবে। বর্তমানে ইসরাইলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কমে গেছে এবং ইরানের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে।
ইসরাইলি গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের একাংশ ট্রাম্পের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করছেন। প্রবীণ ইসরাইলি সাংবাদিক বেন ক্যাসপিট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাকে ওয়াশিংটনের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে, যেখানে সামরিক সিদ্ধান্তের জন্যও ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয়।
এমন সংকটেও নেতানিয়াহু সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা চরম অবস্থান নিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির তেহরানে সর্বাত্মক হামলার দাবি তুলেছেন। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ প্রতিটি ইরানি মিসাইলের জবাবে বৈরুতের ডজন ডজন ভবন ধ্বংসের দাবি জানিয়েছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রী মিকি জোহরও হামলা অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।
বিরোধী শিবিরের ডানপন্থী নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত, বিরোধী দলীয় নেতা অ্যাভিগডোর লিবারম্যান এবং সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গ্যান্টজও ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে রিজার্ভ সেনাদের তলব করতে শুরু করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে যুদ্ধংদেহী এই মনোভাবের বিরোধিতা করেছেন মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল বিরোধী নেতারা। ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু কেবল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং আগাম নির্বাচন এড়াতেই লেবানন ও ইরানে উত্তেজনা উসকে দিচ্ছেন। দলের আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভও বলেন, বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।