মুখ্যমন্ত্রী হয়েই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে চাইছেন শুভেন্দু, কারণ কী?
৪৫ দিনে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর, প্রথম বৈঠকেই ৬ বড় সিদ্ধান্ত শুভেন্দুর
বিবিসি বাংলা
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ০২:০১ এএম
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের সীমান্তের যে অঞ্চলে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেখানে বেড়া দেওয়ার জন্য বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্যটির নতুন মন্ত্রীসভা। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, এটা না করা গেলে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা পরিবর্তন ও সুরক্ষা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শপথ নেওয়ার পরে সোমবারই বসেছিল নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সভাপতিত্বে মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠক।
সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে থাকা আন্তর্জাতিক সীমান্তের যেসব অংশে এখনও কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেই বেড়া দেওয়ার জন্য বিএসএফের কাছে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর করে দেওয়া হবে ৪৫ দিনের মধ্যে।
মন্ত্রীসভার বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমাদের দেশের সুরক্ষার প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গের সুরক্ষার প্রশ্ন এবং যে ভাবে জনবিন্যাস বদলে গেছে, আজ প্রথম দিনেই আমরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর ও বিএসএফকে সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য জমি ট্রান্সফার প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিলাম। ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্যসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। ৪৫ দিনের মধ্যে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে।’
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।
তিনি জানান, এর মধ্যে ১ হাজার ৬৫৩ কিলোমিটার সীমান্ত কাঁটাতার দেওয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে ৫৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত কাঁটাতার দেওয়া বাকি রয়েছে।
ওই ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার অনুপ্রবেশকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজ করছে।
নির্বাচনী প্রচারকালে অমিত শাহ-র দপ্তর থেকে এক্স হ্যান্ডেলে লেখা হয়েছিল যে, পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত সুরক্ষিত করতে ৬০০ একর জমির প্রয়োজন, তা ‘বিএসএফকে দিচ্ছে না মমতা ব্যানার্জী, বিজেপি ক্ষমতায় এলেই সেই জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে’।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই তুলছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও একই অভিযোগ তোলেন।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এই অভিযোগের ক্ষেত্রে বলে আসছিল যে, ‘সীমান্ত আমাদের বিষয় নয়, কেন্দ্র সরকারের বিষয়।’
নির্বাচনের আগে রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরে বাদ গিয়েছিল প্রায় ৯১ লাখ নাম। কঙ্গনা রানাওয়াত-সহ বহু বিজেপি সংসদ সদস্য দাবি করেছিলেন, এই বাদ যাওয়া সবাই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী।
প্রথম বৈঠকে ছয় সিদ্ধান্ত
এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের মহোৎসব হয়েছে।’
পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলকে কৃতজ্ঞতা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ ছাড়াও আজকের বৈঠকে আলোচিত বিষয়ের উপর মোট ছয়টি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তিনি।
এর মধ্যেই আছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য প্রায় ছয়শ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি।
যে সিদ্ধান্তগুলি পশ্চিমবঙ্গের নতুন মন্ত্রীসভা নিয়েছে, সেগুলি হল-
প্রথম, শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বহু বিজেপি কর্মী খুন হয়েছেন। তাদের পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করল এই সরকার।’
দ্বিতীয়, পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস ‘বদলে যাওয়া’ আটকাতে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করা হলো। ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর করা হবে।
তৃতীয়, মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, ‘কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গও আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে যুক্ত হলো।’ একই সঙ্গে উজ্জ্বলা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, বিশ্বকর্মা যোজনাসহ কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে চালু করা হলো বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে এই প্রকল্পগুলি আটকে রাখার অভিযোগ তুলেছিল বর্তমান শাসকদল।
চতুর্থ, পশ্চিমবঙ্গের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া অফিসারদের কেন্দ্রীয় সরকারের ট্রেনিংয়ে যুক্ত করা হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘ডব্লুবিসিএস অফিসারদের কোনও রকম কেন্দ্রীয় সরকারি ট্রেনিংয়ে পাঠানো হতো না।’
পঞ্চম, শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, ‘ভারতের নতুন আইন ‘ভারত ন্যায় সংহিতা’ পশ্চিমবঙ্গে চালু করা হলো’। তিনি অভিযোগ তোলেন যে ভারত ন্যায় সংহিতা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে পুরোনো আইন অনুযায়ী কাজ চালানো হচ্ছিল।
ষষ্ঠ, রাজ্য সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের বয়সসীমা ছাড় দেওয়া হলো। ২০১৫ সাল থেকে রাজ্য সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রমাগত অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। যার জন্য আবেদনকারীদের অতিরিক্ত সময় দেওয়া হলো বলে ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।