পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে মোদি, মমতা ও মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ যেভাবে জড়িয়ে
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত
আর মাত্র দু’দিন পরই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই একাধিক দফায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে এবং প্রতিটি দফা শেষে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও ছিল স্বাভাবিকভাবেই তীব্র ও আত্মবিশ্বাসী। প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল- তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়ই নিজেদের পক্ষে বড় জয়ের দাবি করছে, এমনকি ‘সেঞ্চুরি’ হাঁকানোর কথাও বলছে।
বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি এখন প্রায় নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু রাজনীতিবিদরাই নন, গণমাধ্যমও নির্বাচনের উত্তাপ বাড়াতে এই শব্দ ব্যবহার করছে। বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক লড়াই শুধু ভোটকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বক্তব্যের কৌশল, প্রচারণার ধরন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এখন নির্বাচনের বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রচারণার শক্তি সরাসরি সংঘাতের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে তথ্যযুদ্ধ এবং প্রচারণা বড় ভূমিকা রাখছে। এই প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও আলোচনায় এসেছে, যাকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা ও পাল্টা প্রচারণা চলছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও ৪ মে দুপুরের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাবে, কে কতটা বাস্তবসম্মত দাবি করেছিল এবং কার বক্তব্য কেবলমাত্র ‘বড় বড় কথা’ ছিল। একই সঙ্গে স্পষ্ট হবে, হাওড়ার গঙ্গাপাড়ে অবস্থিত প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতীকী ‘চৌদ্দতলা ভবন’ অর্থাৎ ‘রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র’ তার অভিভাবক পরিবর্তন হচ্ছে কি না।
তবে এবারের নির্বাচনকে শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তনের ভোট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভবিষ্যৎ এবং পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক অবস্থান।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এই বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত ৪২ বছরে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে অন্তত আরও এক দশক তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা যুক্ত হতে পারে। বর্তমানে তাঁর বয়স ৭১ বছর। ১৯৮৪ সালে এক তরুণী প্রার্থী হিসেবে তিনি সিপিএম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন, যা সম্ভব হয়েছিল সেই সময়ের ‘ইন্দিরা ঢেউ’-এর প্রভাবেও।
বর্তমানে তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা কী তা স্পষ্ট নয়। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি তাঁর শেষ বিধানসভা নির্বাচন হতে পারে। যদি তিনি আবারও ক্ষমতায় আসেন, তাহলে হয়তো নিজের রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়ে বড় জয় নিশ্চিত করতে চাইবেন। একই সঙ্গে এটি তাঁর ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবেও বিবেচিত হবে।
এছাড়া রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনা রয়েছে যে, তিনি ক্ষমতায় ফিরলে ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্ব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দিতে পারেন এবং নিজে জাতীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হতে পারেন। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তব হয়, তাহলে ২০২৬ সালের নির্বাচন তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহের জন্যও এই নির্বাচন কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিজেপির দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করা। পূর্ব ভারতে নিজেদের রাজনৈতিক বিস্তার নিশ্চিত করতে এই রাজ্যকে তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
বিজেপি ইতোমধ্যে ওড়িশা, আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। বিহারেও তাদের প্রভাব রয়েছে। ঝাড়খণ্ডে তারা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো তাদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। ফলে ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক লড়াই ২০২৬ সালে এসে একপ্রকার চূড়ান্ত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারও যদি বিজেপি সফল না হয়, তাহলে তাদের অন্তত ২০৩১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এর মধ্যে দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব, কৌশল এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এছাড়া মোদীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও প্রভাব নিয়েও দলের ভেতরে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। বয়সের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, অমিত শাহের অবস্থান অনেকাংশেই মোদীর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। দলের ভেতরে এমন মতও রয়েছে যে, তাঁর অতিরিক্ত কর্তৃত্বের কারণে নতুন নেতৃত্বের উত্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে তাঁর কৌশলগত নেতৃত্বে যদি বারবার ব্যর্থতা আসে, তাহলে তাঁর গুরুত্বও কমতে পারে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। হিন্দু-মুসলিম ইস্যু এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ‘মেরুকরণ’ শব্দটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক পরিভাষা নয়—বরং তা সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বেড়েছে। শুভেন্দু অধিকারী, হুমায়ুন কবিরের মতো নেতাদের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সমাজের শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত অংশের মধ্যেও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রবণতা বাড়ছে, যা অতীতে তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেত।
বাংলায় অতীতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার নজির রয়েছে। তবে এবার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যে পক্ষই জয়ী হোক না কেন, সহিংসতা সাম্প্রদায়িক রূপ নিতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর হার প্রায় ৩০ শতাংশ। এতদিন এই জনগোষ্ঠী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করেই তৃণমূল কংগ্রেস উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয়লাভ করেছে বলে ধারণা করা হয়।
তবে ভবিষ্যতে এই সমীকরণ বদলে যেতে পারে। কারণ, আসন্ন ডিলিমিটেশন বা নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে ভেঙে দেওয়া হতে পারে। এতে করে কোনো আসনেই তারা নির্ধারক শক্তি হিসেবে প্রভাব রাখতে পারবে না।
আসামে ২০২৩ সালের ডিলিমিটেশনের পর মুসলিম-প্রভাবিত আসনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একইভাবে জম্মু-কাশ্মীরেও ২০২০ সালের ডিলিমিটেশনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার প্রতিনিধিত্ব কমানো হয়েছে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে আসন বাড়ানো হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ডিলিমিটেশনের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে দেওয়ার একটি কৌশল নেওয়া হতে পারে।
ফলে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শুধু তাৎক্ষণিক সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামো। বিশেষ করে মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন একদিকে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ অবস্থানেরও বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে এটি পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক গুরুত্ব ভবিষ্যতে কতটা থাকবে—সেই প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। [সূত্র: দ্য ওয়াল]