EN ☀️
×

Follow Us

স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে কমতে পারে স্ট্রোকের ঝুঁকি

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩০ এএম

স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে কমতে পারে স্ট্রোকের ঝুঁকি

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

স্ট্রোক শুধু তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে। এমনকি স্থায়ী পঙ্গুত্বও দেখা দিতে পারে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।

বিশ্ব স্ট্রোক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গত শনিবার রাজধানীর হোটেল হলিডে ইন-এ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসব কথা বলেন। অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের সহযোগিতায় বৈঠকটির আয়োজন করে পপুলার স্ট্রোক অ্যান্ড নিউরোকেয়ার সেন্টার। 

স্ট্রোক চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ

অধ্যাপক ডা. ইফতেখার ইবনে মান্নান বলেন, স্ট্রোকের চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে মস্তিষ্কের ক্ষতি বাড়তে পারে। তাই হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দ্রুত রোগ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা চালু রাখার পাশাপাশি দ্রুত পুনর্বাসন শুরু করাও গুরুত্বপূর্ণ। সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করতে দেরি হলে চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি হয়। তাই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সহজলভ্য রাখতে হবে।

স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী বন্ধ রক্তনালি খুলে দেওয়া, রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং মস্তিষ্কে জমে থাকা রক্ত অপসারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। গুরুতর রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা ও পরবর্তী পুনর্বাসনসেবাও জরুরি।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকলে রোগীর শরীরে ঘা হতে পারে। নিয়মিত পাশ পরিবর্তন, সঠিক নার্সিং পরিচর্যা ও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে এসব জটিলতা কমানো সম্ভব।

স্ট্রোক প্রতিরোধ ও চিকিৎসা দুটিই সম্ভব

অধ্যাপক ডা. জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ২০১৭ সালের জাতীয় সমীক্ষায় বাংলাদেশে প্রতি হাজারে ১১ দশমিক ৩৯ জনের মধ্যে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব পাওয়া যায়। এ হিসাবে দেশে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত। উদ্বেগের বিষয়, তাঁদের ১০ শতাংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে।

তিনি বলেন, ২০২৬ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি চারজনের একজন স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন। বর্তমানে দেশে পঙ্গুত্বের প্রধান কারণ স্ট্রোক। মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণও এটি।

স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করতে ‘বিই ফাস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। এ পদ্ধতিতে কয়েকটি লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখতে হয়।

ব্যালান্স (ভারসাম্য): হঠাৎ হাঁটাচলায় ভারসাম্য হারানো বা মাথা ঘোরা।

আইজ (চোখ): হঠাৎ ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা।

ফেস (মুখ): মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া।

আর্ম (হাত): এক পাশের হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা অবশ লাগা।

স্পিচ (কথা): কথা জড়িয়ে যাওয়া বা স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারা।

টাইম (সময়): এসব লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া।

অধ্যাপক জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, নিয়মিত হাঁটাচলা ও শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ফাস্টফুড ও পোড়া তেলে ভাজা খাবার এড়িয়ে চলা এবং রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানোর মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে ৯০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব।

রোগীর পুনর্বাসন শুধু ফিজিওথেরাপি নয়

অধ্যাপক ডা. এম এম জামান বলেন, রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলে সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পুনর্বাসন শুরু করা যায়। তবে শ্বাস-প্রশ্বাস, নাড়ির গতি ও রক্তচাপ স্থিতিশীল থাকা জরুরি। স্ট্রোকের সক্রিয় প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হয়।

পুনর্বাসন শুধু ফিজিওথেরাপির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, পুনর্বাসন নার্সিং এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক ও সামাজিক সহায়তা।

ফিজিওথেরাপি হাত-পায়ের নড়াচড়া ও পেশির শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি কথা বলা ও খাবার গিলতে সমস্যা কমাতে সহায়তা করে। অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে খাওয়া, পোশাক পরা ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

দ্রুত পুনর্বাসন শুরু করলে রক্ত জমাট বাঁধা, নিউমোনিয়া, পেশি দুর্বল হওয়া এবং অস্থিসন্ধি শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা কমানো সম্ভব। রোগীর উন্নতি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়।

তিনি জানান, পপুলার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের পুনর্বাসনসেবা দেওয়া হয়। চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন। নির্দিষ্ট এলাকায় বাড়িতে গিয়েও পুনর্বাসনসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

সারা দেশে স্ট্রোকের ওষুধ সহজলভ্য হওয়া জরুরি

মো. শামসুল আরিফীন মজুমদার বলেন, হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে যেন দেরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসক দেখানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে সময়ক্ষেপণ কমানো জরুরি।

স্ট্রোক শনাক্ত করতে সিটি স্ক্যান বা এমআরআইয়ের প্রয়োজন হলে দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যন্ত্র, টেকনিশিয়ান, সিরিয়াল কিংবা পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে দেরি হলে চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে।

স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিবিড় পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাঁর মতে, একটি কার্যকর স্ট্রোক কেয়ার ইউনিটে স্ট্রোক শনাক্ত করতে সক্ষম চিকিৎসক, দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা এবং নিবিড় পরিচর্যা ও পুনর্বাসনসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আক্রান্তের ৮৫ শতাংশই ইস্কেমিক স্ট্রোক

অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, স্ট্রোক মস্তিষ্কের রক্তনালির একটি জটিল রোগ। একে ‘ব্রেন অ্যাটাক’ও বলা হয়। মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ইস্কেমিক স্ট্রোক হয়। আর রক্তনালি ফেটে যাওয়ার কারণে প্রায় ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে হেমোরেজিক স্ট্রোক হয়।

হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া কিংবা শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে আসা স্ট্রোকের লক্ষণ। এসব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্ব কিংবা মৃত্যু হতে পারে।

তিনি জানান, আধুনিক চিকিৎসায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার বা মাথার হাড় না কেটেও মস্তিষ্কের রক্তনালির বিভিন্ন সমস্যার চিকিৎসা করা সম্ভব।

রোগীকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ স্ট্রোক সেন্টারে নিতে হবে

ডা. রুহুল কুদ্দুস বলেন, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রক্তনালির বাধা দূর করা না গেলে মস্তিষ্কের লাখ লাখ স্নায়ুকোষ নষ্ট হয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা মৃত্যু ঘটতে পারে।

তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ স্ট্রোক সেন্টারে নিতে হবে। পরবর্তী চিকিৎসা ও পরিচর্যার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর খাবার ও পানি গিলতে সমস্যা হয়। হাত-পা অবশ হয়ে গেলে পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে। খাবার বা লালা শ্বাসনালিতে প্রবেশ করলে ফুসফুসে সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া হতে পারে।

স্ট্রোকের জটিলতায় নিবিড় পরিচর্যা জরুরি

ডা. উজ্জ্বল কুমার মল্লিক বলেন, স্ট্রোকের রোগীদের অন্যতম জটিলতা অ্যাসপিরেশন নিউমোনিয়া। মুখের লালা, থুতু বা খাবার শ্বাসনালি দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করলে এ সমস্যা হতে পারে।

এতে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি এবং মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ বেড়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে রোগীর নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে।

আইসিইউতে শ্বাসনালি সুরক্ষিত রাখা, শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, খিঁচুনি সামলানো ও রোগীর স্নায়বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। জটিলতা নিয়ন্ত্রণ এবং অস্ত্রোপচারের পরবর্তী পরিচর্যায় আইসিইউ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আরও পড়ুন