ভেন্টিলেটর নয়, হাম ঠেকাতে টিকাই একমাত্র পথ: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০২:১২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর দিয়ে নয়, সঠিক সময়ে কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমেই হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিস্তার ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ‘হামের বিস্তার ও জিনগত নজরদারি’ বিষয়ক কর্মশালা ও গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ এবং আইসিডিডিআরবি যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে হামের বিস্তার ও জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার ফলাফলও তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ২০২৪ সালের টিকাদান কর্মসূচিতে সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়া এবং নীতিগত গাফিলতির কারণে যে অনাক্রম্যতার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তারই ফল বর্তমানের হাম পরিস্থিতি। তাঁর ভাষ্য, হাজার হাজার ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ বেড স্থাপন করেও এই মৃত্যুর প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়; হাম প্রতিরোধে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
অবাস্তব আশ্বাস দেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, টিকাদানের গতি শতভাগ বাড়ানো হলেও বর্তমান প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসা ও মাঠপর্যায়ের নজরদারির মাধ্যমে শিশুমৃত্যু কমানোর চেষ্টা চলছে।
শিশু স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী অক্টোবরের মধ্যেই দেশের পাঁচটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে নবনির্মিত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল আনুষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসাসেবা চালু করবে।
তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে দেশের প্রতিটি ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। উপজেলা পর্যায়ে শিশু স্বাস্থ্য, মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি—এই চারটি বিভাগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে বড় পরিসরে জনবল নিয়োগের কথাও জানান ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দ্রুত এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের চলমান জনবল সংকট কাটাতে শিগগিরই পাঁচ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ এবং পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন অনুযায়ী নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের জনবল কাঠামোকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, বারডেম ও হলি ফ্যামিলির মতো স্বায়ত্তশাসিত কিন্তু সরকার-সমর্থিত ব্যবস্থাপনা মডেল স্বাস্থ্য খাতের জন্য কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ। ঢাকার বাইরে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সীমিত থাকায় সারা দেশ থেকে রোগীদের রাজধানীতে আসতে হচ্ছে, যা জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা।
এ কারণে ঢাকার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক।
অনুষ্ঠানে গবেষণার মূল ফলাফল ও তথ্য-উপাত্ত যৌথভাবে উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রধান কারণ ভাইরাসের নতুন কোনো ধরন নয়। বরং বিশ্বজুড়ে প্রচলিত অত্যন্ত সংক্রামক ‘B3’ ধরনের ভাইরাসের বিস্তার, টিকাদানে ঘাটতি এবং মাতৃদুগ্ধ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির কমে যাওয়া এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নয় মাস বয়সের আগেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। এর পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতির কারণে ছয় থেকে নয় মাস বয়সী অপুষ্ট শিশুরা হামে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।