জরুরি ৭৮% ওষুধ নেই সরকারি হাসপাতালে
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বিনামূল্যে চিকিৎসার আশায় সরকারি হাসপাতালে ছুটছে মানুষ; কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধের দেখা মিলছে না। চাহিদার বিপরীতে ওষুধের প্রাপ্যতা গড়ে মাত্র ২২ শতাংশ।
অর্থাৎ প্রয়োজনের ৭৮ শতাংশ ওষুধই কিনতে হচ্ছে ফার্মেসি থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই এই অবস্থা বহাল। এতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নতুন করে আরো দারিদ্র্যের দিকে চলে যাচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার—পিপিআরসির গবেষণায় সরকারি হাসপাতালে ওষুধসংকটের একটি চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণাটি আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে ৯ মাস ধরে জরিপ, সাক্ষাৎকার ও নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গবেষণায় অর্থায়ন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।
গবেষণার তথ্য বলছে, সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা গড়ে মাত্র ২২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় ১০০টি ওষুধের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২২টি; বাকি ৭৮টিই নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে। সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধের মজুদ মাত্র ১২ শতাংশ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৩ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালে ২৪ শতাংশ।
গবেষণায় শুধু ওষুধ নয়, জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটও উঠে এসেছে। এ ছাড়া জেলা, উপজেলা ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে ২২টি প্রতিষ্ঠানে থাকা রোগ নির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশ গত এক বছরে ব্যবহারই করা হয়নি।
দেশের বিভিন্ন জেলার এই চিত্র আরো স্পষ্ট হয় প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে। এতে দেখা যায়, কোথাও চিকিৎসকের লেখা আটটি ওষুধের মধ্যে মিলছে মাত্র একটি, কোথাও আবার একেবারে কোনো ওষুধ নেই। কোথাও আবার দামি ওষুধের বদলে দেওয়া হচ্ছে শুধু প্যারাসিটামল, গ্যাস্ট্রিকের বড়ি কিংবা হিস্টাসিন। বছরের পর বছর ধরে এ পরিস্থিতি বহাল।
ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধসংকট তীব্র: ঢাকার ধামরাই উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে প্রায় এক বছর ধরে কোনো ওষুধ সরবরাহ করা হয়নি। ফলে নরমাল ডেলিভারি, প্রসূতি সেবা ও কিশোর-কিশোরী স্বাস্থ্যসেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চৌহাট, সানোড়া ও সোমভাগ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ পেলেও ওষুধ ছাড়াই ফিরছেন। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ রাসেলও স্বীকার করেছেন, কয়েক বছর ধরে এসব কেন্দ্রে সরকারি কোনো ওষুধ আসেনি।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ঘুরেফিরে কয়েকটি সাধারণ ওষুধ। ৬০ বছর বয়সী সাহেরা খাতুন শরীরের দুর্বলতার কথা জানিয়ে পেয়েছেন প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ। হাসপাতাল সূত্র বলছে, চাহিদার তুলনায় অনেক কম ওষুধ সরবরাহ হওয়ায় চিকিৎসকরাও অনেক ক্ষেত্রে যে ওষুধ রয়েছে সেটাই দিচ্ছেন।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহির্বিভাগের তালিকায় থাকা ৮৪ ধরনের ওষুধের মধ্যে বেশির ভাগই সরবরাহ নেই দীর্ঘদিন ধরে। পেটব্যথা ও বমি নিয়ে আসা নুরুল হোসেনকে চিকিৎসক তিনটি ওষুধ নিতে বললেও হাসপাতাল থেকে একটিও দেওয়া হয়নি। বাইরে থেকে ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই তাঁর। এই রোগী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিনামূল্যে ওষুধ পাব—এ আশায় হাসপাতালে এসে এখন খালি হতে ফিরে যাচ্ছি। কোনো ওষুধ নেই।’
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালেও সাধারণ জ্বর, ব্যথা ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের বাইরে বেশির ভাগ প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। হৃদরোগ, সংক্রমণসহ জটিল রোগের ওষুধ না থাকায় বাড়ছে রোগীর ব্যয়।
পাবনার জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বরাদ্দের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বরাদ্দ অনুযায়ী সবাইকে ওষুধ দেওয়া সম্ভব নয়। রোগীদের অভিযোগ, দুপুরের পর অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রায় পাওয়াই যায় না।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওষুধ সংকটের কথা অস্বীকার করলেও রোগীদের অভিযোগ, সাধারণ কিছু ওষুধ পাওয়া গেলেও দামি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাইরে থেকে কিনতে হয়।
সরকারি হাসপাতালগুলোর বেশির ভাগ কর্তৃপক্ষ ওষুধ সংকটের জন্য সীমিত বরাদ্দ ও অতিরিক্ত রোগীর চাপকে দায়ী করছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, সংকটের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অসম বণ্টন, নজরদারির ঘাটতি এবং অনিয়মের অভিযোগ।
সম্প্রতি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। সঙ্গে ছিলেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা ওষুধ না পাওয়ার কথা জানান। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ সময় একটি পরিত্যক্ত ভবনে কয়েক লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখেন। পাশাপাশি অব্যবহৃত একটি টয়লেটে স্যালাইন, সিরিঞ্জ, ওষুধসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম পড়ে থাকতে দেখেন। এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তুলছে—সমস্যা কি শুধু বরাদ্দে, নাকি ব্যবস্থাপনাতেও?
নতুন করে দরিদ্র হচ্ছে মানুষ
চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা যে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য থেকে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩.৭ শতাংশ।
এ ছাড়া দেশের ৫৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে ধারদেনা করে। কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ সঞ্চয় ভাঙে। অনেক পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। আর প্রায় তিন কোটি মানুষ চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পেরে চিকিৎসাসেবাই নেয় না।
‘জাতীয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি’র সাম্প্রতিক তথ্য আরো ভয়াবহ। দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই ব্যক্তির নিজস্ব পকেট থেকে যায়। এর মধ্যে ওষুধেই খরচ হয় ৬৪.৬ শতাংশ। হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১০.১ শতাংশ, চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে ১৩.৪ শতাংশ এবং রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় ১১.৭ শতাংশ খরচ হয়। চিকিৎসাসামগ্রীতে খরচ হয় ০.১ শতাংশ। অর্থাৎ চিকিৎসায় অন্য সব খাত মিলিয়ে যে অর্থ খরচ হয়, তার প্রায় দ্বিগুণ চলে যাচ্ছে শুধু ওষুধ কিনতেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে এসে রোগীরা প্রেসক্রিপশন ঠিকই পাচ্ছে, কিন্তু ওষুধের অভাবে চিকিৎসা পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না। বিশেষায়িত হাসপাতালের ওষুধের চড়া দাম মেটাতে না পেরে রোগ নির্ণয়ের পরও বহু মানুষ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসার পেছনে এই ‘ক্যাটাস্ট্রফিক’ বা বিপর্যয়কর ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়ছে। এই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙতে এবং দেশের প্রকৃত উন্নয়নের স্বার্থে সরকারি হাসপাতালে ওষুধের শতভাগ বিনামূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
সমাধান কোথায়?
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে ওষুধ সংকটকে শুধু বরাদ্দের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন হাসপাতালভিত্তিক বাস্তব চাহিদা নিরূপণ, চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে বার্ষিক চাহিদা নির্ধারণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ডিজিটাল নজরদারি।
প্রতিটি হাসপাতালে রিয়েল-টাইম ওষুধের স্টক মনিটরিং, ই-প্রেসক্রিপশন, কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহের তথ্য প্রকাশ এবং নিয়মিত স্বাধীন অডিট চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি ওষুধের অপব্যবহার, পাচার বা অনিয়মের অভিযোগের দ্রত তদন্ত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ সরকারি হাসপাতালে ওষুধ না থাকলে শুধু একটি ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হয় না, একটি পরিবার ঋণে ডোবে, কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়, আবার কেউ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়।
অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের কাউন্টার থেকে যখন প্রয়োজনীয় ওষুধের বদলে রোগীকে ‘বাইরে থেকে কিনে নিন’ বলা হয়, তখন বিনামূল্যের চিকিৎসা কার্যত আর বিনামূল্যে থাকে না।’
চিকিৎসকরা প্রতিদিন কী ওষুধ লিখছেন, তার বার্ষিক চাহিদা হিসাব করে তালিকা ধরে ওষুধ কেনা হলে বাজেটের সঠিক ব্যবহার হবে এবং সাধারণ মানুষও হাসপাতালের কাউন্টার থেকেই সব ওষুধ পেয়ে সন্তুষ্ট হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেবল ওষুধই নয়, সাধারণ ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার জন্যও মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালের বাইরে পাঠানো যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের ভেতরে বসেও রোগীকে যেভাবে পকেটের টাকা খরচ করতে হচ্ছে, তা আমাদের গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক কঙ্কালসার দুর্বলতাকেই উন্মোচিত করে।’
তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালের এই করুণ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশের প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত মানুষ। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে এই দরিদ্র পরিবারগুলো বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাদের বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে, কিংবা পড়তে হচ্ছে দেনার দায়ে। হাসপাতালের এই দায়হীনতার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে সন্তানের শিক্ষা ও পুষ্টির মতো মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করছে। তথাকথিত ‘বিনামূল্যে চিকিৎসা’ দিতে এসে রোগীদের এভাবে ঋণের অতল গহ্বরে ঠেলে দেওয়ার এই দুষ্টচক্র এখনই বন্ধ হওয়া জরুরি।
সূত্র: কালের কণ্ঠ