বিশ্ব রক্তদাতা দিবস আজ: স্বেচ্ছায় রক্তদানই হাজারো রোগীর জীবনের ভরসা
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির পরও মানব রক্তের কোনো কৃত্রিম বিকল্প এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে আজও প্রয়োজন আরেকজন সুস্থ মানুষের স্বেচ্ছায় দান করা নিরাপদ রক্ত।
প্রতি বছর ১৪ জুন পালিত হয় বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। দিবসটির উদ্দেশ্য স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের সম্মান জানানো, নিরাপদ রক্তের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়মিত রক্তদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।
চাহিদা ও সংকট
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। রাজধানী ঢাকায় দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সুবিধা কেন্দ্রীভূত থাকায় বিভিন্ন জেলা থেকে জটিল রোগীরা চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন, ফলে রক্তের চাহিদাও বেশি। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় নিরাপদ রক্তের সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
রক্তের প্রয়োজন শুধু দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের জন্য নয়। ক্যান্সার রোগী, থ্যালাসেমিয়া রোগী, কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী, প্রসূতি মা, শিশু রোগী এবং বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা রোগীরা প্রতিনিয়ত রক্তের ওপর নির্ভরশীল।
ক্যান্সার রোগীদের জন্য রক্ত কেন জরুরি
বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং প্রতিবছর নতুন করে ১.৫ থেকে ২ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। কেমোথেরাপি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার পাশাপাশি অস্থিমজ্জার স্বাভাবিক কোষও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে নতুন রক্তকণিকা তৈরির হার কমে যায় এবং তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিন বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে রক্ত দিতে হয়। আবার রক্তের ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে প্লাটিলেটের মাত্রা এত কমে যেতে পারে যে প্লাটিলেট ট্রান্সফিউশন ছাড়া রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
থ্যালাসেমিয়া: জন্ম থেকেই রক্তের ওপর নির্ভরশীল জীবন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করেন। বর্তমানে দেশে আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের শরীরে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। একজন রোগীর প্রতি মাসে একাধিক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে পরিবারগুলোকে নিয়মিত নতুন রক্তদাতা খুঁজতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
কিডনি রোগ ও ডায়ালাইসিস রোগীদের প্রয়োজন
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে। কিডনি এরিথ্রোপয়েটিন নামের যে হরমোন তৈরি করে, তা নতুন লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে সহায়তা করে। কিডনি বিকল হতে শুরু করলে এই হরমোনের উৎপাদন কমে যায় এবং রোগীরা রক্তশূন্যতায় ভোগেন। অনেক ডায়ালাইসিস রোগীর ক্ষেত্রেও রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়।
নিরাপদ রক্তের গুরুত্ব
রক্ত শুধু সংগ্রহ করলেই হবে না, সেটি হতে হবে নিরাপদ। অপরীক্ষিত রক্তের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্ক্রিনিং করা রক্ত সংগ্রহ ও সঞ্চালনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহে কোয়ান্টাম ব্লাড ল্যাবসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ২০০০ সাল থেকে পরিচালিত স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বছরে আনুমানিক ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ব্যাগ রক্তের চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পের আহ্বান
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মানুষ রক্ত দিতে আগ্রহী থাকলেও কর্মব্যস্ততা, দূরত্ব ও যানজটের কারণে রক্তদান কেন্দ্রে যেতে পারেন না। এ কারণে সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সংস্থাগুলোতে নিয়মিত ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প আয়োজন করলে বিপুল পরিমাণ নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ করা সম্ভব।
মাত্র ১৫–২০ মিনিট সময় ব্যয় করে একজন মানুষ অন্য একজনের জীবন বাঁচানোর সুযোগ পান। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধও দৃশ্যমান হয়।
দিবসের বার্তা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “নিরাপদ রক্তের প্রতিটি ব্যাগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি নতুন আশার গল্প।” বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে তারা নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান, অন্যকে উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রক্তদান কর্মসূচি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।