পাঁচ তারকা হোটেলের তকমা কারা দেয়, কীভাবে?
মন্ত্রীদের বৈঠক থেকে ধনকুবেরদের সম্মেলন, সবই হয় পাঁচ তারকা হোটেলে
বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলে মেলে আন্তর্জাতিক মানের সেবা।
রাজধানীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল কাঁচের ভবন, চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা, আর প্রবেশদ্বারে কড়া নিরাপত্তা। যেখানে প্রায়ই বসে সরকারের বৈঠক, ব্যবসায়ী সম্মেলন কিংবা বিদেশি প্রতিনিধিদের আয়োজন। কিন্তু হোটেলকে কেন ‘পাঁচ তারকা’ বলা হয়, কারা দেয় এই স্বীকৃতি এবং কোন শর্ত পূরণ করতে হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর জানেন না অনেকেই।
হোটেলের মান বোঝাতে ‘তারকা’ বা ‘স্টার’ ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরনো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকার ‘মোবিল ট্রাভেল গাইড’ এবং ইউরোপের ‘মিশেলিন গাইড’ পর্যটকদের সুবিধার্থে হোটেল ও রেস্তোরাঁকে রেটিং দেওয়া শুরু করে। জাহাজে বা ট্রেনে যাতায়াত করা দূর-দূরান্তের যাত্রীরা যেন এক নজরেই বুঝতে পারেন কোন হোটেলের মান কেমন, সেজন্যই এই স্টার বা তারকা চিহ্নের প্রবর্তন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের পর্যটন মন্ত্রণালয়, হোটেল অ্যাসোসিয়েশন বা আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন সংস্থা এই রেটিং দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এই মান নির্ধারণের কাজটি করে থাকে।
পাঁচ তারকা হতে গেলে কী কী সুবিধা থাকতে হয়?
একটি হোটেলকে পাঁচ তারকা মর্যাদা পেতে হলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।
• কক্ষ ও সজ্জা: আন্তর্জাতিক মানের বিলাসবহুল রুম, যেখানে ২৪ ঘণ্টা রুম সার্ভিস, সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং, মিনি বার, হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই এবং অত্যাধুনিক বাথরুমের সুবিধা নিশ্চিত থাকতে হবে।
• ডাইনিং বা রেস্তোরাঁ: হোটেলে অন্তত একাধিক মাল্টি-কুইজিন রেস্তোরাঁ থাকতে হবে, যেখানে দেশী খাবারের পাশাপাশি ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, জাপানিজ বা কন্টিনেন্টাল খাবার তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক মানের শেফ থাকবেন।
• নিরাপত্তা ও প্রোটোকল: পাঁচ তারকা হোটেলের সবচেয়ে বড় শক্তি এর নিরাপত্তা। মেটাল ডিটেক্টর, সিসিটিভি আর্কিটেকচার, স্ক্যানার মেশিন থেকে শুরু করে ভিআইপিদের জন্য বিশেষ এসকর্ট বা প্রোটোকল সুবিধা থাকতে হয়।
• অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা: বিশ্বমানের সুইমিংপুল, অত্যাধুনিক জিমনেসিয়াম, স্পা ও ওয়েলনেস সেন্টার, বিশাল বলরুম এবং আন্তর্জাতিক মানের কনফারেন্স হল থাকা বাধ্যতামূলক।
• কর্মীদের পেশাদারিত্ব: এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুজাতিক ভাষা (বিশেষ করে ইংরেজি) জানা এবং উচ্চমানের আতিথেয়তার বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকতে হয়।
এক থেকে পাঁচ তারকা: ফারাকটা যেখানে
হোটেলের তারকা যত বাড়ে, সুযোগ-সুবিধা এবং বিলাসের মাত্রাও তত বৃদ্ধি পায়।
• ১-২ তারকা: শুধুমাত্র রাত যাপনের জন্য মৌলিক সুবিধা (বিছানা ও বাথরুম)।
• ৩ তারকা: মাঝারি মানের সুযোগ-সুবিধা, রুম সার্ভিস এবং ওয়াই-ফাই। এটি সাধারণত বাজেট-বান্ধব।
• ৪ তারকা: উচ্চমানের সেবা, নিজস্ব রেস্তোরাঁ, জিম ও বড় কক্ষের সুবিধা।
• ৫ তারকা: যেখানে গ্রাহকের প্রতিটি চাহিদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রাজকীয় ও ত্রুটিহীন সেবা নিশ্চিত করা হয়।
পাঁচ তারকা হোটেল মানেই কেবল থাকা-খাওয়া নয়, এটি মূলত একটি ‘অল-ইন-ওয়ান’ বা সব সুবিধা এক ছাদের নিচে পাওয়ার কেন্দ্র। বিদেশী কূটনীতিক বা বড় ব্যবসায়ীরা যখন কোনো দেশে আসেন, তখন তাদের নিরাপত্তা, যাতায়াতের ঝামেলা এড়ানো এবং একই ভেন্যুতে মিটিং ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করার জন্য পাঁচ তারকা হোটেলের কোনো বিকল্প থাকে না। দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতেও এই ভেন্যুগুলো বড় ভূমিকা রাখে।
এক কথায়, পাঁচ তারকা শব্দটির পেছনে লুকিয়ে আছে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, বিশ্বমানের আতিথেয়তা আর আভিজাত্যের এক নিখুঁত মেলবন্ধন।