EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

যে হাত হাঁটতে শিখিয়েছে, বার্ধক্যে সেই হাত ধরুন

ফিচার ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম

যে হাত হাঁটতে শিখিয়েছে, বার্ধক্যে সেই হাত ধরুন

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা কি মনে পড়ে? যখন বাইরের পৃথিবীটা ছিল একদম অচেনা, পায়ের নিচের মাটিটা ছিল টালমাটাল। তখন পরম শক্তিতে, পরম মমতায় যে হাতটি আপনাকে আগলে রেখেছিল—সেটি আপনার বাবার কিংবা মায়ের। আপনার প্রতিটি ছোট ছোট পদক্ষেপে পড়ে যাওয়ার ভয় তাড়া করত যাঁদের, তাঁরাই নিজেদের আঙুলটি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আপনার ছোট্ট হাতের মুঠোয়। সেই হাত ধরে আপনি শুধু হাঁটতেই শেখেননি, চিনেছেন এই বিশাল পৃথিবীকে।

অথচ সময়ের চাকা ঘোরে অমোঘ নিয়মে। আজ আপনি বড় হয়েছেন, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, ব্যস্ত হয়েছেন এক তীব্র প্রতিযোগিতার জীবনে। আর ঠিক একই সময়ে, যে হাতগুলো একদিন আপনাকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, সেই হাতগুলো আজ প্রবীণ হয়েছে। বয়সের ভারে, চামড়ার কুঁচকে যাওয়া রেখায় আর হাড়ের দুর্বলতায় সেই হাতগুলো আজ কাঁপছে। শৈশবে তাঁরা যেমন আপনার ভরসা ছিলেন, আজ এই বয়সে এসে তাঁদেরও একজন ভরসার মানুষের বড্ড প্রয়োজন।

জীবন এক অদ্ভুত বৃত্ত। মা-বাবার হাত ধরে সন্তানের বড় হয়ে ওঠা আর শেষ বয়সে এসে মা-বাবার হাতটি সন্তানের শক্ত করে ধরা—এই দুইয়ের মাঝেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং পবিত্রতম ঋণ। প্রবীণ বয়সে মানুষ এক ধরণের মানসিক ও শারীরিক একাকীত্বে ভোগে। এককালের চঞ্চল, কর্মক্ষম মানুষটি যখন ঘরের কোণে আবদ্ধ হয়ে পড়েন, তখন তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটু মনোযোগ, একটু ভালোবাসা আর সন্তানের স্পর্শের।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে মা-বাবারা অনেক সময় অবচেতনভাবেই সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। রাস্তা পার হতে গিয়ে কিংবা একটু সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে যখন তাঁদের পা কাঁপে, তখন যদি সন্তান নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে হাতটি ধরে—তার চেয়ে বড় মানসিক শক্তি তাঁদের জন্য আর কিছুই হতে পারে না। এই হাত ধরা শুধু শারীরিক সহায়তার জন্য নয়; এটি একটি নীরব বার্তা—‘ভয় পেয়ো না মা, ভয় পেয়ো না বাবা, আমি আছি তো!’

ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে না যাক পরম আশ্রয়

আজকের আধুনিক ও যান্ত্রিক জীবনে আমরা ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ আর নিজেদের পরিবার নিয়ে এতটাই মগ্ন যে, ঘরের কোণে বসে থাকা প্রবীণ মা-বাবার দিকে তাকানোর ফুরসতটুকুও যেন মিলছে না। আমরা ভুলে যাই, আজ আমরা যে সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ওই দুটি মানুষই। নিজেদের জীবনের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে, দিন-রাত এক করে যাঁরা আমাদের হাত ছেড়ে দেননি, আজ তাঁদের হাত ছেড়ে দেওয়া কি নৈতিকতার চরম অবক্ষয় নয়?

আমাদের করণীয়

সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা অফিস থেকে ফিরে মা-বাবার পাশে বসুন। তাঁদের হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে জিজ্ঞেস করুন, ‘কেমন আছ?’ এই সামান্য স্পর্শ তাঁদের একাকীত্ব নিমেষেই দূর করে দেবে।

বিকেলে কিংবা ছুটির দিনে তাঁদের সাথে একটু হাঁটুন। শৈশবের মতো এবার আপনি তাঁদের হাত ধরে গাইড করুন। প্রবীণ বয়সে মানুষ একই কথা বারবার বলতে ভালোবাসে। বিরক্তি প্রকাশ না করে ধৈর্য ধরে তাঁদের কথা শুনুন।

পৃথিবীর সব ঋণ হয়তো শোধ করা যায়, কিন্তু মা-বাবার ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সাধ্য কোনো সন্তানের নেই। তবে তাঁদের শেষ জীবনে একটু স্বস্তি দেওয়া, তাঁদের হাতটি শক্ত করে ধরে রাখা আমাদের পরম দায়িত্ব।

মনে রাখবেন, আজ আপনি প্রবীণদের সাথে যে আচরণ করছেন, আপনার সন্তানও কিন্তু তা দেখছে। প্রকৃতি সবসময় নিজের ঋণ সুদে-আসলে ফেরত দেয়। তাই যে হাত একদিন আপনাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে, হাঁটতে শিখিয়েছে, আজ তাঁদের অসময়ে সেই হাতটি পরম মমতায় আপনিই ধরুন!

আরও পড়ুন