রুই-কাতলা নয়, বুড়িগঙ্গায় জাল ফেললেই উঠছে যে মাছ
কেউ কেনে না, তবু ঢাকার নদীগুলো ভরে যাচ্ছে সাকার ফিশে
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২২ পিএম
বুড়িগঙ্গার জেলের জালে আটকা পড়া সাকার ফিশ। ছবি: মেহেদি হাসান
বুড়িগঙ্গার তীরে জাল তুলতেই মুখ কালো হয়ে যায় জেলে রহমত আলীর (ছদ্মনাম)। জালে রুই, কাতলা বা মৃগেল নেই; আটকে আছে চোষকের মতো মুখ আর খসখসে চামড়ার কালচে রঙের কাঁটাযুক্ত একঝাঁক মাছ।
ঢাকার বিভিন্ন নদীর জেলেরা এখন প্রতিদিন এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। বাজারে যে মাছ কেউ কেনে না, সেই ‘সাকার ফিশ’ ক্রমেই দখল করে নিচ্ছে নদী ও দেশি মাছের আবাস।
দক্ষিণ আমেরিকার এই মাছ আশির দশকে অ্যাকোয়ারিয়ামের কাচ ও শৈবাল পরিষ্কারের জন্য ‘ক্লিনার ফিশ’ হিসেবে বাংলাদেশে আনা হয়। আকারে বড় হয়ে গেলে অনেকে একে নদী, খাল বা ড্রেনে ছেড়ে দেন। দূষিত ও কম অক্সিজেনের পানিতেও টিকে থাকতে পারে বলে মাছটি দ্রুত বংশবিস্তার করে।
সাকার ফিশ শিকারি মাছ নয়। এটি জলাশয়ের তলদেশের শৈবাল ও জৈব পদার্থ খেয়ে ফেলে, দেশি মাছের ডিম ও পোনাও নষ্ট করে। ফলে খাবারের প্রতিযোগিতায় দেশি প্রজাতি টিকতে পারছে না।
সাকার ফিশ অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে, এমনকি প্রায় অক্সিজেনহীন দূষিত পানিতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পারে। যেখানে দূষণের কারণে দেশীয় মাছ মারা যাচ্ছে, সেখানে সাকার ফিশ বংশবৃদ্ধি করছে।
ঢাকার নদীগুলোর ওপর নির্ভর করে যে হাজারো জেলের সংসার চলে, সাকার ফিশের কারণে তারা এখন চরম অর্থনৈতিক সংকটে। জেলেরা জানান, নদীতে জাল ফেললে এখন ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই সাকার ফিশ উঠছে। এই মাছের শরীরে শক্ত ও ধারালো কাঁটা থাকায় মাছটি ছাড়াতে গিয়ে দামী জাল ছিঁড়ে যায়। যেহেতু এই মাছ কেউ খায় না এবং বাজারে এর কোনো বাণিজ্যিক মূল্য নেই, তাই দিনশেষে জেলেদের শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যোগ দিচ্ছেন।
কোনোভাবেই যেন কেউ ব্যক্তিগত অ্যাকোয়ারিয়ামের সাকার ফিশ নদী বা পুকুরে না ছাড়ে। নদী থেকে জালে যেসব সাকার ফিশ উঠবে, সেগুলো আবার পানিতে না ছেড়ে মাটিতে পুঁতে বা ধ্বংস করে ফেলতে হবে। এই মাছের উচ্চ প্রোটিনযুক্ত শরীরকে প্রক্রিয়াজাত করে হাঁস-মুরগি বা মাছের বিকল্প খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা বাড়ানো।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণে এমনিতেই আমাদের নদীগুলোর অবস্থা সংকটাপন্ন, তার ওপর সাকার ফিশের এই নীরব আগ্রাসন দেশীয় মাছের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে। এখনই যদি এই ক্ষতিকর মাছটি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও মাঠপর্যায়ের পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম অনেক দেশি মাছ হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখবে।