EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

সেন্টমার্টিন খুলছে, পর্যটন বনাম প্রবালের টিকে থাকার লড়াই

পর্যটকের ভিড় সামলে প্রবাল ও পরিবেশ বাঁচানোর চেষ্টায় কড়াকড়ি। এতে স্বস্তি ও শঙ্কা, দুটোই দেখছেন দ্বীপের ব্যবসায়ীরা

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

সেন্টমার্টিন খুলছে, পর্যটন বনাম প্রবালের টিকে থাকার লড়াই

নতুন নিয়মে পর্যটকদের জন্য খুলছে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন।

অ অ

১ নভেম্বর থেকে আবার পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। তবে এবার দ্বীপের নীল জলরাশি আর নারকেল বিথির ছায়ায় ঘুরে বেড়ানোর আনন্দের সমান্তরালে থাকছে প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার এক কঠিন পরীক্ষা। পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটন ব্যবসার টিকে থাকার লড়াইয়ে সেন্টমার্টিন এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।

টেকনাফ থেকে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে থাকা ৮ বর্গকিলোমিটারের এই ছোট্ট দ্বীপটি বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক দূষণ এবং ভূগর্ভস্থ মিষ্টি পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে দ্বীপের মূল ভিত্তি—প্রবাল প্রাচীর আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। এই প্রেক্ষাপটেই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০২৬-২৭ ভ্রমণ মৌসুমের জন্য একগুচ্ছ নতুন নিয়ম ও বিধিনিষেধ জারি করেছে।

চলতি মৌসুমের শুরুতেই দ্বীপে রাত্রিযাপন নিয়ে এক ধরণের ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। গুঞ্জন ছিল, পরিবেশ সুরক্ষায় কেবল ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে পর্যটকদের রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে গত ২৬ অক্টোবর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি স্পষ্টীকরণে পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত পুরো মৌসুম জুড়েই পর্যটকেরা দ্বীপে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। তবে এই অনুমতির পেছনে রয়েছে পরিবেশ রক্ষার কঠোর অঙ্গিকার।

সংখ্যায় লাগাম, সুরক্ষায় জোর

সেন্টমার্টিনকে বাঁচাতে সরকার এবার শুধু নিয়ম করেনি, বরং তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

• সীমিত পর্যটক: প্রতিদিন ইচ্ছে করলেই হাজার হাজার মানুষ দ্বীপে যেতে পারবেন না। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩,৫০০ জন পর্যটক দ্বীপে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।

• পরিবেশ ফি: দ্বীপে পা রাখতেই প্রতিটি পর্যটককে ১০০ টাকা ‘এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন ফি’ বা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে, যা দ্বীপের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় খরচ করা হবে।

• নির্দিষ্ট রুট: যত্রতত্র থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে কেবল কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া জেটি থেকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপ্রাপ্ত জাহাজগুলোই চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে।

সেন্টমার্টিনের রাতের মূল আকর্ষণ ছিল সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে বারবিকিউ পার্টি কিংবা সৈকতে ফানুস ওড়ানো। কিন্তু মানুষের এই আনন্দ বিষিয়ে তুলছিল দ্বীপের অন্যতম আদি বাসিন্দা 'অলিভ রিডলি' বা জলপাই রঙের সামুদ্রিক কচ্ছপদের জীবন। সৈকতের আলো ও তীব্র শব্দের কারণে মা কচ্ছপেরা ডিম পাড়তে পারছিল না।

তাই এবার দ্বীপে রাতের বেলায় সৈকতে কোনো ধরণের কৃত্রিম আলোকসজ্জা, ফানুস ওড়ানো বা উচ্চশব্দে গান-বাজনা ও বারবিকিউ পার্টি করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিস্তব্ধ ও অন্ধকার সৈকতকে আবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রকৃতির কাছে।

অর্থনীতি বনাম পরিবেশের ভারসাম্য

সেন্টমার্টিনের স্থানীয় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই সাড়ে চার মাসের পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ভ্যান চালক থেকে শুরু করে শুঁটকি ব্যবসায়ী—সবার মনেই এখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিধিনিষেধের কারণে পর্যটক কম হলে যেমন ব্যবসার ক্ষতি, তেমনি দ্বীপটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাই টেকসই পর্যটন বা ‘ইকো-ট্যুরিজম’ই এখন একমাত্র সমাধান।

সেন্টমার্টিন কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি জীবন্ত পরিবেশগত ঐতিহ্য। নিয়ম চাপিয়ে দিয়ে সাময়িকভাবে দ্বীপ রক্ষা করা সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেন্টমার্টিনকে বাঁচাতে প্রয়োজন পর্যটকদের সচেতনতা। চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল সাগরে না ফেলে এবং প্রকৃতির নিয়মকে সম্মান জানিয়ে আমরা যদি ভ্রমণ করতে পারি, তবেই বাঁচবে সেন্টমার্টিন, বাঁচবে আমাদের পর্যটন।

আরও পড়ুন