কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বদলে দিচ্ছে কর্মজগতের চেহারা। লেখালেখি, অনুবাদ, ছবি তৈরি, হিসাব-নিকাশ, তথ্য বিশ্লেষণ থেকে গ্রাহকসেবা—অনেক কাজই এখন কয়েক মুহূর্তে করতে পারছে এআই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মানুষের চাকরি কি এবার সত্যিই ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই একসঙ্গে মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে না; বরং চাকরির ধরন বদলে দেবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি চারটি চাকরির একটি কোনো না কোনোভাবে জেনারেটিভ এআইয়ের প্রভাবে পড়তে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরো চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে কাজের কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
রুটিন কাজ—যেমন তথ্য এন্ট্রি, সাধারণ কাস্টমার সার্ভিস, প্রাথমিক অনুবাদ ও প্রশাসনিক সহায়তা—তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে। বিপরীতে এআই ব্যবস্থাপনা, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কাজের চাহিদা বাড়ছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি স্থানচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি যেমন কিছু কাজ কমাবে, তেমনি নতুন কাজের সুযোগও তৈরি করবে।
বাংলাদেশে ঝুঁকিটা কোথায়?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই তুলনায় সীমিত। এর মধ্যে যেসব তরুণ তথ্য এন্ট্রি, সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন, অনুবাদ, কনটেন্ট লেখা, কল সেন্টার বা অনলাইনভিত্তিক রুটিন কাজের ওপর নির্ভর করছেন, এআইয়ের কারণে তাদের কাজের ধরন দ্রুত বদলাতে পারে।
বাংলাদেশের বড় ফ্রিল্যান্সিং বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। আগে যে কাজের জন্য বিদেশি ক্লায়েন্ট ঘণ্টার পর ঘণ্টা পারিশ্রমিক দিতেন, এআই এখন তার একটি অংশ কয়েক মিনিটে করে দিতে পারে। ফলে কম দক্ষতার কাজের পারিশ্রমিক কমার ঝুঁকি রয়েছে। তবে একই সময়ে এআই ব্যবহার করে দ্রুত ও উন্নতমানের সেবা দিতে পারা দক্ষ ফ্রিল্যান্সারের সুযোগ বাড়তেও পারে।
সমস্যা আরও বড় হতে পারে শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ডিগ্রি অর্জন করলেই যে চাকরি নিশ্চিত হবে—এই ধারণা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময় শুধু সনদ নয়, বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, ইংরেজি যোগাযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তরুণদের করণীয় কী?
বাংলাদেশের তরুণদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এআইকে ভয় না পেয়ে ব্যবহার শেখা। যে পেশায় যেতে চান, সেই পেশায় এআই কীভাবে কাজে লাগানো যায়—সেটি জানতে হবে।
শুধু কম্পিউটার বা এআই টুল চালানো জানলেই হবে না। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ইংরেজি যোগাযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও পেশাগত দক্ষতা।
একজন সাংবাদিক এআই দিয়ে তথ্য সাজাতে পারেন, কিন্তু তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণ তাঁকেই করতে হবে। একজন গ্রাফিক ডিজাইনার এআই দিয়ে দ্রুত নকশা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সৃজনশীল সিদ্ধান্ত তাঁরই। একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী এআই দিয়ে কোড লিখতে পারেন, কিন্তু সেই কোড নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব তাঁর।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে ‘এআই জানা’ নয়, ‘এআই দিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারা’ হবে বড় যোগ্যতা।
শিক্ষাব্যবস্থাতেও পরিবর্তন জরুরি
শুধু তরুণদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও কর্মবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা কমিয়ে বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, গবেষণা ও সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে চাকরিতে থাকা কর্মীদের জন্যও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারণ এআইয়ের প্রভাব শুধু নতুন চাকরিপ্রার্থীদের ওপর নয়, বর্তমানে কর্মরত মানুষের ওপরও পড়বে।
বাংলাদেশের জন্য এআই একদিকে চাকরি হারানোর ঝুঁকি, অন্যদিকে বৈশ্বিক কর্মবাজারে নতুন সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা। কম দক্ষতার রুটিন কাজ কমতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তি ও মানবিক দক্ষতার সমন্বয়ে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘এআই কি চাকরি কেড়ে নেবে?’—এখানে থামিয়ে রাখলে চলবে না। বাংলাদেশের তরুণদের এখন প্রশ্ন করতে হবে—‘এআইয়ের যুগে আমি কীভাবে নিজের দক্ষতার মূল্য বাড়াব?’
কারণ আগামী দিনের কর্মবাজারে সবচেয়ে নিরাপদ হয়তো সেই চাকরিই, যেখানে মানুষ এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে এআইকে নিজের কাজের শক্তিতে পরিণত করতে পারে।
