লিংকডইন কি ফেসবুক হয়ে যাচ্ছে?
পেশাদার নেটওয়ার্কের বদলে ব্যক্তিগত গল্পে ভরে যাচ্ছে লিংকডইনের নিউজফিড
পেশাদার নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম লিংকডইনে এখন বাড়ছে ব্যক্তিগত ও আবেগঘন পোস্টের সংখ্যা। ছবি: সান গ্রাফিক
কাজের বাজারে নিজেকে তুলে ধরা, পেশাদার নেটওয়ার্ক তৈরি করা কিংবা কাঙ্ক্ষিত চাকরির খোঁজ—সবকিছুর জন্য বিশ্বজুড়ে এক নামে পরিচিত প্ল্যাটফর্ম ‘লিংকডইন’। কর্পোরেট দুনিয়ায় নিজের দক্ষতা প্রমাণের এই মঞ্চ দীর্ঘদিন ধরে বজায় রেখেছিল এক ধরনের গাম্ভীর্য ও পেশাদারিত্ব।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লিংকডইনের নিউজফিড স্ক্রল করলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে—আমরা কি ভুল করে ফেসবুকে চলে এলাম? ব্যক্তিগত জীবনের আবেগঘন গল্প, পারিবারিক ভ্রমণের ছবি, রান্নার রেসিপি, এমনকি ব্রেকআপ বা ডিভোর্সের মতো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ও এখন নিয়মিত জায়গা করে নিচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মে। এসব পোস্টে যুক্ত হচ্ছে হাজার হাজার লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মনেও বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—লিংকডইন কি ধীরে ধীরে ফেসবুকের নতুন সংস্করণে রূপ নিচ্ছে?
কয়েক বছর আগেও লিংকডইনের চেনা রূপ ছিল কর্মক্ষেত্রের সাফল্য, পদোন্নতি, নতুন চাকরি বা ব্যবসায়িক আইডিয়া শেয়ার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান চিত্র ভিন্ন। এখন অনেক ব্যবহারকারী তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পকে জোর করে কর্পোরেট বা পেশাদার শিক্ষার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে পোস্ট করছেন। যেমন—‘আজ সকালে কফি কাপ পড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে আমি যেভাবে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট শিখলাম!’ কিংবা ‘পারিবারিক ভ্রমণ কীভাবে আমার লিডারশিপ স্কিল বাড়াল।’
বিশ্লেষকদের মতে, প্ল্যাটফর্মটির অ্যালগরিদম এখন এমন সব কনটেন্টকে বেশি প্রমোট করছে, যা মানুষের আবেগ বা অনুভূতিকে স্পর্শ করে। ফলে রিচ বা ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমে অনেকেই পেশাদারিত্বের সীমারেখা মুছে ফেলছেন। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো লিংকডইনেও এখন তৈরি হয়েছে এক বিশাল ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ গোষ্ঠী। এই মোটিভেশনাল স্পিকার ও ক্যারিয়ার কোচদের মূল লক্ষ্যই থাকে যেকোনো উপায়ে পোস্ট ভাইরাল করা, ফলে জীবনমুখী বা চটকদার নীতিবাক্যের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আসল শিক্ষণীয় বা পেশাদার কনটেন্ট। অনেকেই অভিযোগ করছেন, চাকরির খোঁজ বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আলোচনার চেয়ে এখন নিউজফিডে অপ্রাসঙ্গিক পোস্টের সংখ্যাই বেশি।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে লিংকডইনের বাণিজ্যিক কৌশল। ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার সময় বাড়াতে তারা ফেসবুকের মতোই লাইক, লাভ, সাপোর্ট বা কিউরিয়াস ইমোজির মতো রিঅ্যাকশন বাটন চালু করেছে। মানুষ যত বেশি সময় এখানে কাটাবে, লিংকডইনের বিজ্ঞাপন ও প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন থেকে আয়ও তত বাড়বে। এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের (জেন-জি) কর্মক্ষেত্রে প্রবেশও একটি বড় কারণ। তারা কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনকে আলাদা করে দেখার চেয়ে দুটোর মিশ্রণ পছন্দ করে।
এই রূপান্তর নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদলের মতে, কর্মক্ষেত্রের মানুষ তো রোবট নয়, তাদেরও আবেগ ও গল্প আছে। তাই লিংকডইন একটু মানবিক হওয়া মোটেও খারাপ কিছু নয়—এতে সহকর্মীদের সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে কট্টর পেশাদারদের মতে, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যমের ছড়াছড়ি তো চারপাশেই আছে। লিংকডইন যদি তার স্বতন্ত্র গাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলে, তবে পেশাদারদের জন্য আর কোনো নিরাপদ বা নির্ভরযোগ্য জায়গা অবশিষ্ট থাকবে না।
লিংকডইন হয়তো পুরোপুরি ফেসবুক হবে না, তবে কর্পোরেট দুনিয়ার এই প্ল্যাটফর্ম যে বেশ দ্রুত গতিতেই রূপ পাল্টাচ্ছে, তা নিশ্চিত। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে লিংকডইন তার আসল উদ্দেশ্য ‘পেশাদার নেটওয়ার্কিং’ ধরে রাখতে পারে, নাকি শেষ পর্যন্ত এটিও আরেকটি সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিণত হয়।