অতিরিক্ত তথ্য কীভাবে আমাদের ক্ষতি করছে?
তথ্যের চাপে হচ্ছে ব্রেন ফগ, সিদ্ধান্তহীনতা ও ঘুমের সমস্যা
অতিরিক্ত তথ্যের চাপে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় ‘ব্রেন ফগ’।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুল ছোঁড়ানো এখন আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। ফেসবুকের নিউজফিড, হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ, ইমেইলের নোটিফিকেশন আর দেশ-বিদেশের হাজারো খবরের স্রোতে ভেসে আমাদের দিন শুরু হয়।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আমরা কত সচেতন ও জ্ঞানী হচ্ছি! কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তথ্যের এই লাগামহীন জোয়ার বা ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’ নিঃশব্দে আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে, কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা।
তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির কারণে আজ যে-কোনো তথ্য আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই অসীম তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বড় ফাঁদ। মানুষের মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। যখন সেই সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি তথ্য প্রতিদিন আমাদের মাথায় ঢুকতে থাকে, তখন মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘ব্রেন ফগ’। এর ফলে মানুষ কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, যাকে বলা হয় ‘অ্যাটেনশন স্প্যান ডেফিসিট’।
অতিরিক্ত তথ্য জানার সবচেয়ে বড় অপকারিতা হলো ‘অ্যানালাইসিস প্যারালাইসিস’ বা সিদ্ধান্তহীনতা। একটি সাধারণ উদাহরণ দেওয়া যাক— আগে মানুষ বাজারে গিয়ে দুই-তিনটি ব্র্যান্ডের মধ্য থেকে একটি সাবান বা শ্যাম্পু সহজেই বেছে নিত। আর এখন ইন্টারনেটে শত শত রিভিউ, রেটিং আর মতামত দেখে মানুষ এতটাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে যে, সামান্য একটি পণ্য কিনতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করে। জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও মারাত্মক রূপ নেয়। যত বেশি তথ্য সামনে আসে, মানুষ তত বেশি দ্বিধায় পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে।
তথ্যের এই অতিরিক্ত চাপ কেবল আমাদের চিন্তাভাবনাকেই ব্যাহত করছে না, এটি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও চরম ক্ষতি করছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও নিউজ পোর্টালগুলোতে প্রতিনিয়ত নেতিবাচক খবর, অপরাধ, যুদ্ধ আর অন্যের কৃত্রিম সুখী জীবনের ছবি দেখতে দেখতে আমাদের অবচেতন মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা ও অস্থিরতা তৈরি হয়। এটি মস্তিষ্কে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা সার্বক্ষণিক উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মূল কারণ।
শারীরিক দিক থেকেও এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের। রাতে ঘুমানোর আগে স্ক্রিন স্ক্রল করার অভ্যাসের কারণে মেলাটোনিন হরমোন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি হয়, যা অনিদ্রার অন্যতম কারণ। এর ফলে দিনের পর দিন ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ এবং কর্মদক্ষতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
তাহলে এই তথ্যের গোলকধাঁধা থেকে মুক্তির উপায় কী?
বিশেষজ্ঞরা এখন গুরুত্ব দিচ্ছেন ‘ডিজিটাল ডায়েট’ বা তথ্য নিয়ন্ত্রণের ওপর। শরীর সুস্থ রাখতে আমরা যেমন অতিরিক্ত খাওয়া পরিহার করি, ঠিক তেমনি মানসিক সুস্থতার জন্য তথ্যের অপচয় রোধ করতে হবে। প্রতিদিন সকালে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যটুকু ছাড়া বাকি সময় সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, সপ্তাহে অন্তত একদিন ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা এবং তথ্যের নির্ভরযোগ্য সুনির্দিষ্ট ১-২টি উৎস বজায় রাখার মাধ্যমেই কেবল এই আধুনিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তথ্যের সাগরে ডুবে না গিয়ে, জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার সময় এখনই।