EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

পাঁচ বছরে কমেছে ৫০০ টাকার বাজারের সামর্থ্য

চাল, তেল, ডিম ও মুরগির দাম বাড়ায় এখন ৫০০ টাকায় পুরো বাজার সারা যাচ্ছে না

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২০ পিএম

পাঁচ বছরে কমেছে ৫০০ টাকার বাজারের সামর্থ্য

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় বাজারে টান পড়েছে সাধারণ মানুষের হাতের টাকায়।

অ অ

পাঁচ বছর আগে হাতে ৫০০ টাকা থাকলে একজন মানুষ চাল, তেল, ডিম আর মুরগি—সবকিছু নিয়েই বাজার থেকে ফিরতে পারতেন। এখন একই ৫০০ টাকায় বাজারের তালিকা থেকে কিছু একটা বাদ দিতে হয়। কারণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে অনেকখানি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে টাকার অঙ্ক এক থাকলেও তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে চোখে পড়ার মতো।

২০২১ সালের ৬ নভেম্বর দেশের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয়েছিল ৪৪-৪৫ টাকায়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী পরের বছরগুলোতে একই দিনে একই মানের চাল বিক্রি হয়েছে ৫২-৫৫ টাকায়, আর ঢাকার বাইরে প্রান্তিক অঞ্চলে পরিবহন খরচ ও মজুদপ্রবণতার কারণে দাম ছিল আরও বেশি। অর্থাৎ পাঁচ বছরে প্রতি কেজি মোটা চালেই বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৮-১০ টাকা। যে মানুষ মাসে ২০-৩০ কেজি চাল কেনেন, তার জন্য এই বাড়তি অঙ্কটা মাস শেষে বড় একটা চাপ হয়ে দাঁড়ায়।

নিত্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় লাফ দেখা গেছে ভোজ্যতেলে। ২০২১ সালের মে মাসে টিসিবির হিসাবে দেশের বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৩৫-১৪৫ টাকা। এরপর ধাপে ধাপে দাম বেড়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়, এবং পাঁচ লিটারের বোতলের দাম দাঁড়ায় ৯৭৫ টাকা। মানে পাঁচ বছরে এক লিটার তেলেই খরচ বেড়েছে প্রায় ৫৫-৬০ টাকা। একটা পরিবারে মাসে ২-৩ লিটার তেল লাগলে শুধু এই একটা পণ্যেই বাড়তি ব্যয় হচ্ছে ১৫০-১৮০ টাকা।

ডিম আর মুরগির দামের গল্পটাও একই রকম। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২০ সালে সাধারণ বাজারে ডিমের ডজন ৯০ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করত এবং ফার্মের মুরগির জাতীয় গড় দাম ছিল কেজিতে ১২৫ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে সেই চিত্র বদলে গেছে অনেকখানি। রাজধানীর বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৯০ টাকায়, আর ডিমের ডজন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। আবার কোনো কোনো সপ্তাহে সরবরাহ সংকট বা অন্য কারণে ডিমের দাম আরও বেশি বেড়ে যায়—এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের ডজন ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকায় ঠেকার ঘটনাও দেখা গেছে সম্প্রতি। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ, যাদের কাছে ডিম সাশ্রয়ী আমিষের প্রধান উৎস।

ধরা যাক, একজন ক্রেতা বাজারে গিয়ে ২ কেজি চাল, ১ লিটার তেল, ১ ডজন ডিম আর ১ কেজি ব্রয়লার মুরগি কিনতে চান।

পাঁচ বছর আগে এই বাজার সারতে খরচ হতো মোটামুটি এভাবে—চাল ২ কেজি (৯০ টাকা), তেল ১ লিটার (১৪০ টাকা), ডিম ১ ডজন (১০০ টাকা), মুরগি ১ কেজি (১৩০ টাকা)। মোট খরচ দাঁড়াত প্রায় ৪৬০ টাকা। অর্থাৎ ৫০০ টাকা হাতে থাকলে পুরো বাজার সেরেও ৪০ টাকা থেকে যেত।

এখন একই বাজার সারতে গেলে খরচ পড়বে—চাল ২ কেজি (১১০ টাকা), তেল ১ লিটার (১৯৯ টাকা), ডিম ১ ডজন (১৪০ টাকা), মুরগি ১ কেজি (১৯০ টাকা)। মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৬৩৯ টাকা। অর্থাৎ ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে এখন এই তালিকার একটা পণ্য পুরোপুরি বাদ দিতে হয়, নয়তো পরিমাণ কমাতে হয়।

এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে বছরের পর বছর ধরে, যার প্রভাব পড়েছে আমদানি খরচে। জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ বেড়েছে, যা প্রতিটি পণ্যের দামে যোগ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামের ওঠানামাও দেশের বাজারে প্রভাব ফেলেছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সাধারণ মানুষের বেতন বা আয় এই হারে বাড়েনি। ফলে হাতে টাকার অঙ্ক একই থাকলেও তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা প্রতিনিয়ত কমছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে স্বল্প বেতনে চাকরি করা মানুষদের জন্য এই বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন