টাকায় সব মেলে, মেলে না শুধু ঢাকার জ্যাম থেকে মুক্তি
টাকা থাকলে আজকাল প্রায় সবকিছুই কেনা যায়—দামি বাড়ি, চকচকে গাড়ি, এমনকি সময়ও। কিন্তু জ্যাম থেকে মুক্তি কেনার সাধ্য নেই কারও
ঢাকার এক ব্যস্ত সিগন্যালে দামি গাড়ি ও সাধারণ যানবাহন পাশাপাশি জ্যামে আটকে—শহরের যানজটে যেন মুছে যায় শ্রেণিবৈষম্যের রেখা।
টাকা থাকলে আজকাল প্রায় সবকিছুই কেনা যায়—দামি বাড়ি, চকচকে গাড়ি, এমনকি মানুষের সময়ও কিছুটা কেনা যায় বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় নেমে সেই বিশ্বাস প্রতিদিন ভেঙে যায়। এখানে কোটি টাকার গাড়িতে বসে থাকা মানুষটিও ঠিক ততটাই অসহায়, যতটা পাশের রিকশাওয়ালা বা বাসের যাত্রী। জ্যাম থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো একটা সেকেন্ড সময়ও এখানে কেউ কিনতে পারেন না।
রাজধানীর পিচঢালা রাস্তাগুলো যেন এক অদ্ভুত মঞ্চ, যেখানে প্রতিদিন মঞ্চস্থ হয় একই নাটক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই শহরের মানুষের মূল্যবান সময় হারিয়ে যায় চিরচেনা যানজটে। কোনো সিগন্যালে মিনিটের পর মিনিট, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকাটাই যেন ঢাকাবাসীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই বিরক্তিকর দুর্ভোগের ভেতরেই প্রতিদিন ঘটে যায় একটা মজার ঘটনা, যা হয়তো অনেকে খেয়ালই করেন না।
আমাদের সমাজে ধনী, গরিব আর মধ্যবিত্তের মধ্যে দূরত্ব অনেক। কিন্তু ঢাকার জ্যামে এসে সেই দূরত্ব যেন এক মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আরামদায়ক গাড়িতে বসে থাকা মানুষটি যেমন জ্যামে আটকে থাকেন, ঠিক তার পাশেই সিটিং সার্ভিসের ভিড়ে ঘামতে থাকা মানুষটিও আটকে থাকেন একই সিগন্যালে। দামি গাড়ি বা মোটা অঙ্কের টাকা—কোনো কিছুই কাউকে এক ইঞ্চি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না।
মার্সিডিজ, সাধারণ প্রাইভেট কার, রিকশা কিংবা লোকাল বাস—সবাই বাঁধা পড়ে যায় একই জ্যামের সুতোয়। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় ধনীর ব্যস্ততা আর সাধারণ মানুষের ক্লান্তি—দুটোই একসঙ্গে থমকে দাঁড়ায় রাস্তার মাঝখানে।
সংখ্যায় বোঝা যায় সমস্যা কতটা গভীর
শুধু চোখে দেখা দৃশ্য নয়, পরিসংখ্যানও বলছে ঢাকার যানজট সমস্যা কতটা ভয়াবহ। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে, ২০০৭ সালে ঢাকার রাস্তায় গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার। কিন্তু এখন সেই গতি নেমে এসেছে ঘণ্টায় মাত্র ৪ থেকে ৫ কিলোমিটারে—যা একজন মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতির চেয়েও কম।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকার যানজটে প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা—এই টাকা দিয়ে চাইলে বানানো যেত দুটি সম্পূর্ণ মেট্রোরেল লাইন। কোনো কোনো গবেষণা বলছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট আর দূষণ মিলিয়ে দেশের জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে প্রতিবছর, আর এর কেন্দ্রেই রয়েছে ঢাকা।
সময় সবার জন্যই সমান মূল্যবান
ঢাকার জ্যামের কাছে একজন প্রতিষ্ঠানপ্রধানের জরুরি মিটিং আর একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষার হলে সময়মতো পৌঁছানো—দুটোরই মূল্য যেন সমান হয়ে যায়। আধুনিক জীবনে টাকা দিয়ে প্রায় সবকিছু কেনা গেলেও, জ্যাম থেকে মুক্তির এক সেকেন্ড সময়ও কেউ কিনতে পারেন না।
প্রতিদিন আমরা শ্রেণিবৈষম্য, ক্ষমতার দাপট আর সম্পদের অহংকার নিয়ে কত রকম প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকি। কিন্তু ঢাকার রাজপথ যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়—কিছু বাস্তবতার সামনে আমরা সবাই সমানভাবে অসহায়। এই দুর্ভোগের ভেতরেও একটা অদ্ভুত শিক্ষা লুকিয়ে থাকে—টাকা আর প্রতিপত্তির পেছনে ছুটতে থাকা মানুষ যখন জ্যামে আটকে পাশের বাসযাত্রীর দিকে তাকান, তখন হয়তো নিজের অজান্তেই বুঝতে পারেন, দিনশেষে সবাই একই ভোগান্তির যাত্রী।
তবে এই ‘সাম্য’ নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। বরং এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা এতটাই গভীর যে তা ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবন, সময় আর অর্থনীতিকে প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করাটাই তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।