স্মার্টফোনে অনলাইন জুয়া ও গেমে আসক্ত শিশু। প্রতীকী ছবি
১২ বছর বয়সী রাফাত। ঢাকার মীরপুরে একটি লেদ মেশিনের কারখানায় কাজ করে সে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে তার ক্লান্ত চোখে যখন ঘুমের রাজ্য ভর করার কথা, তখন তার আঙুলগুলো ক্ষিপ্র গতিতে চলে সস্তা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের ওপর। কখনো লুডুর চাল, কখনো ফ্রি-ফায়ার গেমের ইন-গেম কারেন্সি বা ডায়মন্ডের টুর্নামেন্ট, আবার কখনো নিষিদ্ধ বেটিং (জুয়া) সাইটের রঙিন গ্রাফিক্সের গোলকধাঁধায় কাটে তার মাঝরাত।
‘প্রথম প্রথম বন্ধুরা মিলে মোবাইলে লুডু খেলতাম দশ-বিশ টাকা বাজি ধরে। জিতলে আনন্দ হতো, সেই টাকা দিয়ে খাবার খেতাম। এখন দিনে অন্তত চার-পাঁচশ টাকা বাজি না ধরলে ভালো লাগে না। গত মাসে কারখানার জমানো বেতনের সব টাকা এক রাতে হেরে গেছি,’ মলিন মুখে বলছিল রাফাত। তার চোখের নিচের কালো দাগগুলো বলে দিচ্ছিল, এই সস্তা স্ক্রিনটি কীভাবে তার ঘুম আর শৈশব দুটোই কেড়ে নিয়েছে।
এটি কেবল রাফাতের একার গল্প নয়। করোনাকালের পর থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা যেমন বেড়েছে, ঠিক তেমনি নিঃশব্দে থাবা বসিয়েছে অনলাইন জুয়া ও গেমের ভেতরের বাজি ধরার প্রবণতা।
ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা নীতিমালার আলোকেই বলা যায়, এই নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল আসক্তি’ শিশুদের এক অদৃশ্য ও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ডিজিটাল ট্র্যাপ’ বা প্রযুক্তির ফাঁদ। শহরের সচ্ছল পরিবারের শিশুরা যখন ভিডিও গেমকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখছে, প্রান্তিক অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত বা শ্রমজীবী শিশুরা সেখানে একে দেখছে ‘সহজে টাকা আয়ের’ একটি মাধ্যম হিসেবে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন গেমের ক্ষতিকর আসক্তির সাথে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও পড়াশোনার পারফরম্যান্সের গভীর ঋণাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। বিকাশ বা রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে খুব সহজেই এই জুয়ার টাকা লেনদেন হচ্ছে, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির মধ্যে পড়ছে না।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একজন চাইল্ড সাইকিয়াট্রিস্টের মতে, ‘অনলাইন জুয়া বা বাজির এই আসক্তি শিশুদের মস্তিষ্কের ডোপামিন হরমোনের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করে দেয়। যখন একটি শিশু অল্প বয়সে বাজিতে জেতার উত্তেজনা বা হারার চরম হতাশার মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার আচরণে উগ্রতা চলে আসে। এটি তাদের পরবর্তীতে বড় কোনো অপরাধের দিকে ধাবিত করতে পারে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে বর্তমানে বেট ৩৬৫, ৮৮ স্পোর্টস, বেটওয়ে, ডাফাবেট, বেটফেয়ার, বাজীগর, প্লেবেট৩৬৫, ৯ক্রিকেট, বিডিটি১০, টাকা৬৫ ও বেট বাটারফ্লাই-সহ প্রায় অর্ধশতাধিক অনলাইন জুয়ার সাইট সক্রিয় রয়েছে। অল্প টাকায় রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এসব বেটিং সাইট শুধু রাফাতদের মতো প্রান্তিক শিশুদেরই নয়, বরং দেশের লাখো তরুণকে সর্বস্বান্ত ও বিপথগামী করছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) নজরদারি বাড়িয়ে এই সাইটগুলো প্রতিনিয়ত ব্লক বা বন্ধ করলেও জুয়াড়িরা দমে যাচ্ছে না। বিদেশে বসে পরিচালনাকারীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে রাতারাতি ডোমেইন বা ওয়েবসাইটের নাম সামান্য পরিবর্তন করে হুবহু নতুন সাইট চালু করছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা ও তরুণেরা ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে বন্ধ হয়ে যাওয়া সাইটগুলোতেও অনায়াসে জুয়া খেলছে। একই সাথে বিভিন্ন বেটিং সাইটের মোবাইল অ্যাপসও ছড়িয়ে পড়েছে, যা প্রযুক্তিগতভাবে পুরোপুরি বন্ধ করা বেশ জটিল।
তথ্য বলছে, এই অন্ধকারের জগতে শিশুদের টেনে আনার পেছনে কাজ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সাধারণত এসব সাইটে সরাসরি অ্যাকাউন্ট খোলা যায় না। তাই জুয়াড়িদের সহায়তায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ। এমনকি ইউটিউবেও প্রকাশ্যেই শেয়ার করা হচ্ছে জুয়া খেলার নিয়মাবলী বা টিউটোরিয়াল ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই প্রলোভন ও চটকদার ভিডিও দেখে কৌতূহলবশত বাজি ধরতে এসে হাজারো শিশু-কিশোর আজ এই মরণফাঁদে নিজেদের সঁপে দিচ্ছে।
পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার কারণ
কুড়িগ্রামের একটি চরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম জানান এক উদ্বেগজনক বাস্তবতার কথা। ‘আগে শিশুরা স্কুল ফাঁকি দিত মাঠের কাজের জন্য বা দারিদ্র্যের কারণে। আর এখন স্কুল ফাঁকি দেয় রাতে জেগে মোবাইল গেম আর বাজি খেলার ক্লান্তিতে। ক্লাসে এসে তারা ঘুমে ঢলে পড়ে। অনেক বাবা-মা ভাবেন সন্তান মোবাইলে পড়াশোনা করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে কী সর্বনাশ হচ্ছে, তা তারা বুঝতেই পারেন না।’
দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত এই পরিবারগুলোর অভিভাবকেরা নিজেরাও প্রযুক্তির এই অন্ধকার দিক সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন। রাফাতের মা রেহেনা বেগম অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘কষ্টের উপার্জনের টাকা দিয়ে ওরে মোবাইল কিনে দিছিলাম যাতে ভালো থাকে। এখন শুনি ও জুয়া খেলে! মোবাইল কেড়ে নিলে ও ঘর ভাঙচুর করে, খাওয়া বন্ধ করে দেয়।’
প্রয়োজন যৌথ প্রতিরোধ
প্রথাগত ও কায়িক শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে দেশে সুনির্দিষ্ট আইন ও শাস্তির বিধান থাকলেও, এই ‘ডিজিটাল জুয়া’ বা মানসিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে আমাদের প্রচলিত আইনি কাঠামো এখনও বেশ দুর্বল। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিনিয়ত রূপ বদলানো হাজারো জুয়ার সাইট বা অ্যাপ স্রেফ ব্লক করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি এবং সামাজিক প্রতিরোধের এক সমন্বিত প্রয়াস।
এই বিপর্যয় থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে অবিলম্বের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কঠোরতা: বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টগুলোতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের (১৮ বছরের নিচে) জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সন্দেহজনক বা জুয়ার সাইট-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের গতিবিধির ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর আর্থিক গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা: প্রান্তিক ও শ্রমজীবী পরিবারের অভিভাবকদের ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিগত সচেতনতা বাড়াতে হবে। সন্তান মুঠোফোনে পড়াশোনা করছে নাকি সর্বনাশা কোনো জুয়ার ফাঁদে পা দিচ্ছে, সে বিষয়ে নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিকল্প বিনোদনের অভাব দূরীকরণ: প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মাঠের খেলাধুলা, পাড়া-মহল্লায় লাইব্রেরি বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করতে হবে; যেন তারা সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে স্ক্রিন নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারে।
রাফাতের মতো হাজারো শিশুর সোনালী শৈশব যেন কোনো অনলাইন জুয়ার বোর্ডের সস্তা ঘুঁটি হয়ে হারিয়ে না যায়। স্ক্রিনের নীল আলো যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখ ধাঁধিয়ে তাদের জীবনকে অন্ধকারে তলিয়ে না দেয়, সেই যৌথ দায়িত্ব আজ রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সবার।