সাংবাদিক মানেই কি শুধু রিপোর্টার? পর্দার আড়ালের মানুষটাকে চেনার সময় এসেছে
মাইক্রোফোন হাতে রিপোর্টারকেই সবাই চেনেন। কিন্তু খবরটা পাঠকের কাছে নেওয়ার পেছনে যিনি ঘাম ঝরান, তাঁকে চেনার সময়টা এসেছে
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪২ পিএম
মাইক্রোফোন হাতে রিপোর্টার আর কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে ফটোগ্রাফার—খবর তুলে আনার এই দৃশ্যই মানুষের চেনা ‘সাংবাদিকতা’।
সন্ধ্যায় টিভি খুললেই দেখা যায় একজন মানুষকে— মাইক্রোফোন হাতে, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে, নেতার পেছনে ছুটছেন, কিংবা দুর্ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করছেন। পত্রিকার পাতায় নামটাও চোখে পড়ে স্পষ্ট— বাইলাইনে বড় হরফে লেখা থাকে তাঁর নাম। এই মানুষটাই দেশের কোটি কোটি মানুষের চোখে ‘সাংবাদিক’। আর হবেই না কেন— তিনিই তো একমাত্র মুখ, যাঁকে মানুষ দেখতে পায়, চিনতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে।
কিন্তু একটা খবর যখন পাঠকের হাতে পৌঁছায়, তার পেছনে থাকে আরও একজন মানুষ— যাঁকে কেউ কখনো টিভিতে দেখে না, যাঁর নাম কোনো বাইলাইনে ছাপা হয় না। তিনি সাব-এডিটর। অফিসের চার দেয়ালের ভেতর, স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা এই মানুষটার কাজ সাধারণ পাঠকের কাছে প্রায় অদৃশ্য— অথচ তাঁর হাত না ঘুরলে কোনো খবরই প্রকাশযোগ্য হয় না।
কেন মানুষ শুধু রিপোর্টারকেই চেনে
এটা দোষের কিছু না, বরং স্বাভাবিক। মানুষ যা দেখে, তাকেই চেনে। রিপোর্টার থাকেন প্রকাশ্যে— ঘটনাস্থলে, সংবাদ সম্মেলনে, ক্যামেরার সামনে। তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়, তাঁর মুখ দেখা যায়। কিন্তু সাব-এডিটরের কাজ ঘটে পর্দার পেছনে, নিউজরুমের ভেতরে, যেখানে সাধারণ পাঠকের কোনো প্রবেশাধিকার নেই। ফলে তাঁর অস্তিত্বই বেশিরভাগ মানুষের কাছে অজানা থেকে যায়।
অদৃশ্য এই মানুষটা আসলে কী করেন
একটা খবর রিপোর্টারের হাত থেকে যখন প্রথম বের হয়, তখন সেটা কাঁচা তথ্যের স্তূপ মাত্র— তাড়াহুড়ায় লেখা, অগোছালো বাক্য, হয়তো কিছু ভুল তথ্যও। সাব-এডিটরের কাজ শুরু হয় ঠিক এখান থেকেই।
তথ্য যাচাই করে দেখা, কোথাও ভুল বা অসঙ্গতি আছে কিনা, আইনি ঝুঁকি বা মানহানিকর বাক্য থাকলে তা সংশোধন করা, ভাষা প্রমিত করে পাঠযোগ্য করে তোলা, আকর্ষণীয় ও সঠিক শিরোনাম বসানো, খবরের গুরুত্ব বুঝে তাকে যথাযথ স্থানে সাজানো— এই প্রতিটি ধাপ পাঠকের কাছে অদৃশ্য থাকে, অথচ প্রতিটি ধাপই সিদ্ধান্ত নেয়— খবরটা আদৌ ছাপা হবে কিনা, আর হলেও কীভাবে হবে।
প্রক্রিয়াটা জানা কেন জরুরি
একটা খবর যখন কোনো পত্রিকা বা অনলাইন পোর্টালে প্রকাশ পায়, পাঠক ধরে নেন এটা এক ব্যক্তির একক কাজ। বাস্তবে এটা একটা শৃঙ্খল— রিপোর্টার তথ্য আনেন, সাব-এডিটর তাকে যাচাই করে নির্ভরযোগ্য রূপ দেন, তারপর তা পাঠকের কাছে পৌঁছায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটা জানা থাকলে পাঠক বুঝতে পারবেন, একটা নির্ভরযোগ্য খবরের পেছনে আসলে কতজন মানুষের শ্রম মিশে থাকে— আর কেন একটা ভুল খবর ঠেকানো এত জটিল একটা কাজ।
সাংবাদিকতা কোনো একক ব্যক্তির কীর্তি নয়, এটা একটা সম্মিলিত প্রক্রিয়া। রিপোর্টার যদি হন খবরের সংগ্রাহক, সাব-এডিটর তাহলে তার প্রহরী— যিনি নিশ্চিত করেন খবরটা সঠিক, নিরাপদ ও পাঠযোগ্য হয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছাবে। এই দুই ভূমিকা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। কোটি মানুষ যতদিন শুধু ক্যামেরার সামনের মুখটাকেই সাংবাদিকতা বলে জানবে, ততদিন এই পেশার আসল চেহারাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এবার সেই অসম্পূর্ণ ছবিটা পূর্ণ করার সময় হয়েছে।