EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

বর্ষায় রূপের জোয়ার, সংকটে অস্তিত্ব: কেমন আছে চলনবিল?

প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১.৮৩ বর্গকিলোমিটার হারে চলনবিলের আয়তন কমছে

ফিচার ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

বর্ষায় রূপের জোয়ার, সংকটে অস্তিত্ব: কেমন আছে চলনবিল?

বর্ষায় থৈ থৈ জলে ভাসছে চলনবিল, সৌন্দর্য পর্যটকদের টানলেও অপরিকল্পিত নানা কারণে অস্তিত্ব সংকটে দেশের বৃহত্তম এই বিল। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

বর্ষার মেঘ কেটে আকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ। আর নিচে যতদূর চোখ যায়, শুধু থৈ থৈ জলরাশি। মৃদু বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে সিংড়া-তাড়াশ ডুবন্ত সড়কের বুকে। দূর দিগন্তে বিলের পানির সাথে মিশে গেছে নীল আকাশ।

কিন্তু নাটোর, সিরাজগঞ্জ আর পাবনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত এই দেশের বৃহত্তম বিলের গল্পটা কি শুধুই রূপের? ডেস্কে বসে সংগৃহীত তথ্য এবং স্থানীয়দের যাপিত জীবনের খতিয়ান মেলালে রূপের আড়ালে দেখা মেলে এক ভিন্ন চলনবিলের।

চলনবিল এক অদ্ভুত জাদুকর। বর্ষায় সে ধারণ করে এক বিশাল সাগরের রূপ। আত্রাই, গুড়, আর বড়াল নদীর পানি এসে একে একে ভাসিয়ে দেয় বিলের চারপাশ। আবার শীত আসতেই এই রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। পানি নেমে গিয়ে জেগে ওঠে মাইলের পর মাইল উর্বর পলিমাটি। তখন সেখানে ঢেউ খেলে সবুজ ফসলের খেত, বিশেষ করে হলুদে মোড়ানো সরিষার খেত। এই দ্বৈত রূপই চলনবিলকে করেছে অনন্য।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চলনবিল ডেস্কে বসা সাংবাদিকদের জন্য বড় খোরাক জোগাচ্ছে এর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের পরিবর্তনের কারণে। বিশেষ করে সিংড়া থেকে তাড়াশ পর্যন্ত নির্মিত সড়কটি বর্ষায় যখন পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন সেটি রূপ নেয় এক অভূতপূর্ব পর্যটন কেন্দ্রে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে আসছেন এই ‘ডুবা রাস্তা’ দেখতে। কুন্দইল সেতু বা বিলের মাঝে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো শহরবাসীর জন্য এখন এক বড় বিনোদন। বিলের তাজা মাছের স্বাদ নিতেও ভিড় জমছে স্থানীয় বাজারগুলোতে।

শুধু সৌন্দর্য দেখলেই চলবে না, তাকাতে হবে এর ভেতরের সংকটে। পরিবেশবিদদের তথ্য এবং সরকারি আর্কাইভ বলছে, দিনে দিনে ছোট হয়ে আসছে চলনবিলের আয়তন। বিলের বুক চিরে তৈরি হওয়া অসংখ্য অপরিকল্পিত বাঁধ, কালভার্ট ও সড়ক প্রাকৃতিকভাবে পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১.৮৩ বর্গকিলোমিটার হারে চলনবিলের আয়তন কমছে। অঞ্চলের ৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৭১টি প্রধান খাল ও নালার মধ্যে প্রায় ৩৬৮ কিলোমিটারই (৯০.২৪%) পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ১৯৯৫ থেকে ২০১০ সাল—এই ১৫ বছরেই বিলের বুকে ১,১৮৮.৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু ও ৮৫৫টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে, যা পানি চলাচলের স্বাভাবিক গতি নষ্ট করেছে। ফলে বর্ষার পর পলি জমে বিলের তলদেশ ভরাট হচ্ছে দ্রুত।

এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে বিলের মৎস্যসম্পদেও। ১৯৮২ সালে যেখানে চলনবিলে ২৬,৯৯০ টন দেশি মাছ উৎপাদিত হতো, কয়েক দশকের ব্যবধানে তা নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে (১২,১১৭ টন)। শিল্পকারখানার বর্জ্য, কৃষি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, কারেন্ট জালের বেপরোয়া তাণ্ডব এবং জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরার কারণে বিলের দেশি প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে।

চলনবিল কেবল একটি জলাভূমি নয়, এটি উত্তরবঙ্গের প্রাণের স্পন্দন। বর্ষার এই অপরূপ সৌন্দর্য ও প্রাণবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে পরিকল্পিত ড্রেজিং এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। তা না হলে হয়তো আগামী কয়েক দশক পর আমাদের আফসোস করে লিখতে হবে—‘প্রমত্তা চলনবিল এখন শুধুই অতীত’।

আরও পড়ুন