EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

জ্যাম নেই, বাসাভাড়া নেই, তবু রোজ অফিস—এমন ঢাকা কি সত্যিই সম্ভব?

যদি গ্রামের বাড়ি থেকেই রোজ অফিস করা যেত, বেঁচে যেত সেই টাকা, কমত জ্যামও

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম

জ্যাম নেই, বাসাভাড়া নেই, তবু রোজ অফিস—এমন ঢাকা কি সত্যিই সম্ভব?

জ্যামমুক্ত রাস্তা, ভাড়াহীন জীবন—বুলেট ট্রেন কি বদলে দিতে পারে ঢাকার এই চিরচেনা চিত্র? প্রতীকী ছবি

অ অ

ডেস্কে বসে এক বিকেল। টেবিলে একগাদা খবরের স্তূপ, খবরের গন্ধ আর কি-বোর্ডের খটখট শব্দের মাঝেও মাথার ভেতর তখনো ঘুরপাক খাচ্ছে দুপুরের সেই চেনা ক্লান্তি। প্রতিদিন অফিসে আসার পথে গাবতলী, টেকনিক্যাল কিংবা মিরপুরের জ্যামে যখন বাসটা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখন মাথায় ঘুরপাক খায় আরেকটা হিসাবও—মাসের বেতনের একটা বড় অংশ তো চলে যায় শুধু ঢাকায় টিকে থাকার খরচেই। বাসাভাড়া, মেসের খাবার, যাতায়াত—সব মিলিয়ে রোজগারের প্রায় অর্ধেকটাই যেন গলে যায় শুধু ‘ঢাকায় থাকা’-র জন্য।

তখনই মনে হয়, যদি এমন হতো—সকালে নিজের গ্রামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছে যাওয়া যেত, দিনশেষে আবার ফিরে যাওয়া যেত সেই একই বাড়িতে? তাহলে তো আর আলাদা করে ঢাকায় থাকার প্রয়োজনই পড়ত না—না বাসাভাড়া, না জ্যামের যন্ত্রণা।

এই সম্ভাবনার নামই বুলেট ট্রেন—ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা এমন এক প্রযুক্তি, যা চীন-জাপানে আজ বাস্তবতা। ভাবুন তো, সিরাজগঞ্জের মতো দূরের কোনো জেলা থেকেও যদি এই গতিতে যাতায়াত করা যেত, তাহলে সকাল আটটায় গ্রামের বাড়িতে মায়ের হাতের নাস্তা খেয়ে ট্রেনে উঠে সাড়ে আটটার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যেত ঢাকার বুকে—বসুন্ধরা বা কারওয়ান বাজারের কর্মস্থলে। দিনশেষে ঠিক একইভাবে আবার ফিরে যাওয়া যেত নিজের চেনা নীড়ে।

বাসাভাড়ার বোঝা: মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় খরচের খাত

বাংলাদেশের শহরমুখী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ চলে যায় বাসাভাড়ায়। এর ওপর যোগ হয় মেস বা হোটেলের বাড়তি খাবার খরচ—কারণ পরিবার ছেড়ে একা থাকা মানুষকে রান্না-বান্নার সুযোগ কম পেয়ে বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয় প্রায়ই।

মানুষ যদি ঢাকার বাইরে নিজের বাড়িতে থেকেই কাজের সুযোগ পেতেন, তাহলে এই দুটো বড় খরচের খাত থেকেই তাঁরা রেহাই পেতেন। বাসাভাড়া আর বাড়তি খাবার খরচ বাবদ প্রতি মাসে যে টাকাটা এখন খরচ হয়ে যাচ্ছে, সেটাই তখন জমা হতে পারত সঞ্চয়ের খাতায়। আর এই সঞ্চয় কাজে লাগত সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, কিংবা দৈনন্দিন জীবনের আরও জরুরি প্রয়োজনে—যেসব জায়গায় এখন টান পড়ে বাসাভাড়া মেটাতে গিয়ে।

জ্যামে হারিয়ে যাওয়া কর্মঘণ্টার হিসাব

গাবতলী বা টেকনিক্যালের জ্যামে আটকে থেকে প্রতিদিন যে লাখো কর্মঘণ্টা রাস্তায় নষ্ট হয়, তার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। ঢাকায় প্রতিদিন লাখো মানুষ অফিসে যাওয়া-আসার পথে গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা ব্যয় করেন শুধু যানজটে। এই সময়টা যদি কর্মক্ষেত্রে যোগ হতো, বা পরিবারের সঙ্গে কাটানো যেত, তাহলে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিপর্যায়ে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ত।

মানুষ যদি নিজ শহর থেকে যাতায়াত করতে পারতেন এবং প্রতিদিন যাঁরা বাধ্য হয়ে ঢাকায় থাকছেন তাঁদের একটা বড় অংশ যদি এই সুযোগ পেতেন, তাহলে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমত, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও কমত। কম গাড়ি মানেই কম জ্যাম—আর জ্যাম কমলে সেই বেঁচে যাওয়া সময় মানুষ ব্যয় করতে পারতেন কাজে, সৃজনশীলতায়, কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে।

গোছানো, সবুজ ঢাকার সম্ভাবনা

জনসংখ্যার এই চাপ কমলে তার প্রভাব পড়ত শহরের ভৌত পরিবেশেও। জনাকীর্ণ কংক্রিটের জঙ্গল ভেদ করে ঢাকা হয়তো আবার কিছুটা ফিরে পেত তার সবুজ রূপ। কম মানুষ মানে কম আবাসনের চাপ, আর কম আবাসনের চাপ মানে খোলা জায়গা ও সবুজায়নের জন্য বেশি সুযোগ। একটা শহর যখন তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ বহন করতে বাধ্য হয়, তখন পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়ে। জনসংখ্যার চাপ কমলে এই সমীকরণটাও বদলাতে শুরু করে—ধীরে ধীরে ঢাকা হয়ে উঠতে পারে আরও গোছানো, বাসযোগ্য একটা শহর।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা যা বলছে

জাপানের শিনকানসেন ১৯৬৪ সালে চালুর পর মানুষ শহরতলি বা দূরের শহরে থেকেও টোকিওতে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পান—এই মডেলে শহরগুলো একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে, একক কোনো শহরের ওপর জনসংখ্যার আধিক্য চাপ তৈরি হয় না। চীনও গত দুই দশকে বিশ্বের বৃহত্তম হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যদিও প্রতিটি রুট সমানভাবে অর্থনৈতিক সফলতা পায়নি। তাই বাংলাদেশের জন্যও শুরুতেই এমন রুট বেছে নেওয়া জরুরি হবে, যেখানে যাত্রীসংখ্যা যথেষ্ট বেশি।

বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ অবশ্যই সহজ নয়। হাই-স্পিড রেলের জন্য প্রয়োজন হয় আলাদা উড়াল লাইন, যার নির্মাণ ব্যয় সাধারণ লাইনের চেয়ে ৫ থেকে ৮ গুণ বেশি। বাংলাদেশের নরম পলিমাটি আর অসংখ্য নদী-জলাশয় এই নির্মাণকাজকে আরও জটিল করে তোলে। আর বিশাল বিনিয়োগ তুলে আনতে গিয়ে টিকিটের দাম বেশি হয়ে গেলে, তা সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে থাকবে কি না—সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ যে লক্ষ্যে এই পরিকল্পনা, অর্থাৎ মধ্যবিত্তের খরচ কমানো, টিকিটের দাম বেশি হয়ে গেলে সেই লক্ষ্যই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।

তবে চ্যালেঞ্জ থাকা মানেই যে স্বপ্নটা অবাস্তব, তা নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একলাফে পূর্ণাঙ্গ বুলেট ট্রেনে না গিয়ে ধাপে ধাপে এগোনো যেতে পারে—প্রথমে বিদ্যমান ট্র্যাক আধুনিকায়ন করে গতি বাড়ানো, ভবিষ্যতের করিডোরের জন্য এখনই জমি সংরক্ষণ করে রাখা, আর আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নের পথ খোঁজা।

জ্যামহীন রাস্তা, ভাড়াহীন জীবন—এই দুটো স্বপ্নই আসলে একটা সুতোয় গাঁথা। প্রতিদিন লাখো মানুষের হারিয়ে যাওয়া কর্মঘণ্টা, বাসাভাড়ায় শেষ হয়ে যাওয়া সঞ্চয়ের সুযোগ, আর কংক্রিটের চাপে হারিয়ে যাওয়া রাজধানীর সবুজ—এই সংকটগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

বুলেট ট্রেন হয়তো আজ অনেকের কাছে বিলাসী কল্পনা। কিন্তু জ্যামে বসে থাকা প্রতিটি মানুষের চোখ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়—জ্যামহীন, ভাড়াহীন সেই ঢাকা একেবারে অসম্ভব নয়। প্রশ্নটা শুধু, আমরা সেই পথে হাঁটতে প্রস্তুত কি না।

আরও পড়ুন