কেমন কাটল রেকর্ড ভাঙা-গড়ার বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড?
গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে ‘কিং মেসি’, রোনালদোর আক্ষেপ
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসি, রোনালদো, এমবাপে, হালান্ড ও ভিনিসিউস। ছবি: সান কোলাজ
বিশ্বকাপের ঢাকে কাঠি পড়েছে বেশ কিছুদিন হলো। উত্তেজনা, হতাশা, চমক আর রেকর্ড— সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এই টুর্নামেন্ট ইতিমধ্যে অনেক কিছু দিয়ে দিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের। গ্রুপ পর্ব এখন শেষের দিকে। ছয়টি গ্রুপের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে, বাকিদের হিসাব চুকবে ২৮ জুনের মধ্যে। তারপরই শুরু হবে ‘রাউন্ড অব ৩২’- এর সেই আসল লড়াই, যেখানে একটি ভুলই শেষ করে দিতে পারে পুরো স্বপ্ন।
কিন্তু এই মুহূর্তে মাঠের বাইরেও একটা লড়াই চলছে— গোল্ডেন বুটের লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে এখন যা পরিস্থিতি, তা দেখে মনে হচ্ছে ফুটবলের ঈশ্বর যেন ইচ্ছে করেই গল্পটা এভাবে সাজিয়েছেন।
লিওনেল মেসিকে নিয়ে নতুন করে কী বলার আছে? তবু বলতে হয়, কারণ এই বয়সে এই ফর্ম সত্যিই অবিশ্বাস্য। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচের প্রতিটিতে গোল, মোট ৫টি— এই মুহূর্তে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
তবে শুধু গোলের হিসাবের বাইরেও একটা দৃশ্য এবারের বিশ্বকাপে অনেককে কাঁদিয়ে দিয়েছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে ইনজুরি থেকে ফিরে নেইমার মাত্র ১৫ মিনিটের জন্য মাঠে নামলেন। সেই দৃশ্য ভাষায় বোঝানো কঠিন। মেসির চোখে যে আগুন, তাতে মনে হয় না তিনি থামার কথা ভাবছেন। আগামী ২৮ জুন জর্ডানের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে তাঁর পা থেকে আর কী বের হয়, সেটা দেখার অপেক্ষায় এখন কোটি মানুষ।
মেসি যদি এ আসরের রাজা হন, তাহলে যুবরাজের লড়াইটাও দারুণ। ব্রাজিলের ভিনিসিউস জুনিয়র গ্রুপ পর্বে টানা তিন ম্যাচে গোল করেছেন, তিনবারই জিতেছেন ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’। ৪ গোল নিয়ে মেসির পরেই আছেন তিনি।
তবে সংখ্যার বাইরে একটু গেলে দেখা যাবে, ভিনির নামের পাশে একটি অ্যাসিস্টও আছে, যেটা মেসি বা এমবাপের নেই। টুর্নামেন্টের শেষে যদি গোলসংখ্যায় সমতা তৈরি হয়, এই অ্যাসিস্টই হয়তো ঠিক করে দেবে গোল্ডেন বুটটা কার ঘরে যাবে।
আজ ২৬ জুন রাতে বস্টনে ফ্রান্স ও নরওয়ে মুখোমুখি হচ্ছে গ্রুপ ‘আই’- এর শেষ ম্যাচে। দুই দলেরই পয়েন্ট ৬, দুই দলই নকআউট নিশ্চিত করে ফেলেছে আগেই। কাগজে-কলমে তাই এই ম্যাচে হারলেও কোনো দলের সমস্যা নেই। কিন্তু মাঠে যখন এমবাপে আর হালান্ড থাকেন, তখন ‘ফর্মালিটি’ বলে কিছু হয় না।
কিলিয়ান এমবাপে এই বিশ্বকাপে এসে ছুঁয়ে ফেলেছেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড— বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬ গোল। আজ একটি গোল করলেই ক্লোসাকে পেছনে ফেলবেন। আর যদি জোড়া গোল বা হ্যাটট্রিক হয়, তাহলে মেসিকেও টপকে যেতে পারেন চলতি আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে।
অন্যদিকে হালান্ড। নরওয়েকে একাই বহন করে চলেছেন এই যন্ত্রমানব। টুর্নামেন্টে ৪ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ভালোভাবেই আছেন। এমবাপে বনাম হালান্ড— আজকের ম্যাচে এই দ্বন্দ্বটাই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বয়স ৪১। ৯০০-র বেশি গোল পকেটে। কিন্তু যে জিনিসটা এখনো নেই— বিশ্বকাপ ট্রফি। সেই অতৃপ্তিটা এখনো তাঁর চোখে দেখা যায়।
প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর সাথে ড্র, নিজে গোল নেই— সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া পর্তুগালের হয়ে জোড়া গোল করে রোনালদো যেন বলে দিলেন, ‘এখনো শেষ হয়নি।’ আগামী ২৮ জুন কলম্বিয়ার বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচ। ৬ পয়েন্টে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করা কলম্বিয়ার বিপক্ষে ৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা পর্তুগালের জন্য ম্যাচটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রোনালদোর স্বপ্নটা এখনো বেঁচে আছে।
প্রথম ছয়টি গ্রুপ থেকে ১২টি দল ইতিমধ্যে নকআউটের টিকিট পকেটে পুরেছে। গ্রুপ ‘এ’ থেকে ৯ পয়েন্টে চ্যাম্পিয়ন মেক্সিকো ও ৪ পয়েন্টে দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্রুপ ‘বি’ থেকে ৭ পয়েন্টে সুইজারল্যান্ড ও ৪ পয়েন্টে কানাডা। গ্রুপ ‘সি’ থেকে সমান ৭ পয়েন্টে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ব্রাজিল ও মরক্কো। গ্রুপ ‘ডি’ থেকে ৬ পয়েন্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ৪ পয়েন্টে অস্ট্রেলিয়া। গ্রুপ ‘ই’ থেকে সমান ৬ পয়েন্টে গোল ব্যবধানের সুবাদে জার্মানি ও আইভরি কোস্ট এবং গ্রুপ ‘এফ’ থেকে ৭ পয়েন্টে নেদারল্যান্ডস ও ৫ পয়েন্টে জাপান।
এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া দুটো দলের উঠে আসাটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জাপান নেদারল্যান্ডসের সাথে ২-২ ড্র দিয়ে শুরু করে তিউনিসিয়াকে ৪-০ উড়িয়ে দিয়েছে— এই দলটি যে নিছক ‘এশিয়ান দল’ নয়, সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে। আগামী ২৯ জুন হিউস্টনে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে ব্লু সামুরাইরা— সেটাও একটা দেখার মতো লড়াই হবে। আর টনি পপোভিচের অস্ট্রেলিয়া তুরস্ককে ২-০ হারিয়ে শুরু করে, আমেরিকার কাছে হেরেও শেষ ম্যাচে প্যারাগুয়ের সাথে ০-০ ড্র করে গোল ব্যবধানে টিকিট কেটেছে নকআউটের।
২৮ জুনের পর পুরো লাইনআপ চূড়ান্ত হলেই বোঝা যাবে শেষ বত্রিশের পূর্ণ চেহারা। তবে এটুকু এখনই বলা যায়— এবারের বিশ্বকাপ কোনো সমীকরণের খাঁচায় আটকে থাকার নয়। মাঠের প্রতিটি মিনিট লিখে যাচ্ছে ফুটবলের নতুন ইতিহাস।
