আমি ব্রাজিল ভালোবাসি, কারণ ব্রাজিল স্বপ্ন দেখায়
ভিনিসিউসের পায়ে যখন পেলের ছায়া, তখন লক্ষ কোটি সমর্থকের বুকে আবার জ্বলে উঠেছে ষষ্ঠ শিরোপার আগুন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তমঞ্চে ব্রাজিলের পতাকা হাতে সমর্থক। ছবি: চিত্রমানব
রাত তখন তিনটা। চোখে ঘুম নেই। হাতে চায়ের কাপ। স্ক্রিনে হলুদ-সবুজ জার্সি। এটা কোনো অস্বাভাবিক দৃশ্য নয়— এটা প্রতিটি ব্রাজিল সমর্থকের বিশ্বকাপ রাতের চিরচেনা ছবি।
আমিও তার ব্যতিক্রম নই।
বৃহস্পতিবার রাতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে যখন ৭ মিনিটেই ভিনিসিউস জুনিয়রের বাম পা থেকে বল জালে জড়াল, তখন বুকের ভেতরে যে অনুভূতি হলো— সেটা শুধু একটা গোলের আনন্দ নয়। সেটা বহু বছরের অপেক্ষার, বহু রাতের কষ্টের, ২০১৪-র সেই ৭-১-এর ক্ষতের উপর ধীরে ধীরে জমা হওয়া প্রলেপের অনুভূতি।
ব্রাজিলকে ভালোবাসা মানে একটা দর্শনকে ভালোবাসা। পেলের সেই জাদুকরী পা, রোনালদোর অট্টহাসি, রোনালদিনহোর সেই ফ্রি-কিক— প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্রাজিল ফুটবল শুধু শিরোপা জেতেনি, মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছে।

পাঁচটি বিশ্বকাপ। সবচেয়ে বেশি। কিন্তু শেষটা এসেছিল ২০০২ সালে— চব্বিশ বছর আগে। এরপর কেটে গেছে চারটি বিশ্বকাপ। এসেছে হতাশা, এসেছে সেই কালো রাত— ২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের লজ্জা।
সেই ক্ষত এখনও শুকায়নি পুরোপুরি। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে মনে হচ্ছে— হয়তো এবার।
রিও ডি জেনেইরোর এক দরিদ্র পরিবারের ছেলে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মাঠে যেতেন, পুরনো বল নিয়ে খেলতেন। সেই ছেলে আজ রিয়াল মাদ্রিদের ১১ নম্বর জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ মাঠ কাঁপাচ্ছেন।
এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনটি ম্যাচে টানা গোল। মোট গোল ৪, অ্যাসিস্ট ১। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসি আর এমবাপের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছেন তিনি।
কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় কথা হলো— ভিনিসিউসের খেলার মধ্যে একটা নির্ভয় আনন্দ আছে। ড্রিবল করেন হেসে হেসে, গোল করেন উদযাপন করেন দলকে নিয়ে। এই আনন্দময় ফুটবলই তো ব্রাজিলের আসল পরিচয়।
মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র দিয়ে শুরু। সেদিন একটু ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আবার হয়তো সেই পুরনো ব্যর্থতার গল্প। কিন্তু না— হাইতিকে ৩-০, স্কটল্যান্ডকে ৩-০। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে ব্রাজিল।

এই দলে শুধু ভিনিসিউস নন— আলিসোনের মতো বিশ্বমানের গোলকিপার আছেন, মার্কিনহোসের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার আছেন, ব্রুনো গিমারেসের মতো মেধাবী মিডফিল্ডার আছেন। কুনহা প্রতিটি ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করছেন।
এই দলটা শুধু একজনের উপর নির্ভরশীল নয়। এটাই এবারের ব্রাজিলের শক্তি।
ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন— বাস্তব না আবেগ?
২৯ জুন নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচ। সামনে আরও কঠিন পথ। ফ্রান্স আছে, আর্জেন্টিনা আছে, ইংল্যান্ড আছে। বিশ্বকাপ সহজ নয়, কখনোই ছিল না।
কিন্তু একজন সমর্থক হিসেবে আমি জানি— স্বপ্ন দেখাটাই আমাদের অধিকার। প্রতিটি বিশ্বকাপেই আমরা স্বপ্ন দেখি। কখনো ভেঙে যায়, কখনো হয়তো পূরণ হবে।
এবার মনে হচ্ছে— সময় এসেছে।
হলুদ জার্সিটা পরে রাখুন। চায়ের কাপটা হাতে নিন। রাত জাগার প্রস্তুতি নিন। কারণ এই ব্রাজিল দলটা আপনাকে হতাশ করবে না।
অন্তত এবার— আমার মন তাই বলছে।
লেখক একজন ব্রাজিল ভক্ত এবং ডেইলি সান অনলাইনের সহ-সম্পাদক।
