সনদ আছে, কাজ নেই— স্বপ্নভঙ্গের দেশে লাখো তরুণ
শিক্ষা শেষ করেও বেকার, হতাশায় ডুবছে একটি প্রজন্ম
ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করা রাকিব হাসানের বয়স এখন ৩৩। গ্র্যাজুয়েশনের পর ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। দুই শতাধিক চাকরির আবেদন করেছেন, পরীক্ষা দিয়েছেন ডজনখানেক। ফল? শূন্য। বাবার পাঠানো টাকায় ঢাকার মেসে থেকে এখনো ঘুরছেন দরজায় দরজায়। ‘সনদ আছে, কিন্তু কাজ নেই— এই দেশে পড়াশোনা করে কী লাভ হলো?’— প্রশ্নটা তার একার নয়, লাখো তরুণের।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এখন ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হচ্ছেন প্রায় ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েট। কিন্তু আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে তার অর্ধেকেরও কম। বাকিরা হয় অনানুষ্ঠানিক খাতে ঢুকছেন, নয়তো বেকার থাকছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে বাংলাদেশে যুব বেকারত্বের হার এখন ১২ শতাংশেরও বেশি, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূলে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হওয়া তরুণদের একটি বড় অংশের নেই কারিগরি দক্ষতা, নেই ইংরেজিতে যোগাযোগের সক্ষমতা, নেই প্রযুক্তির সাথে পরিচিতি— যা বর্তমান চাকরির বাজারে অপরিহার্য।
অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘আমরা ডিগ্রি দিচ্ছি, কিন্তু দক্ষতা দিচ্ছি না। বাজার চাইছে একটা জিনিস, আমরা তৈরি করছি আরেকটা।’
সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহও এ সংকটকে জটিল করে তুলছে। লাখো তরুণ বছরের পর বছর বিসিএস প্রস্তুতিতে সময় পার করছেন, কিন্তু আসন সীমিত। এর বাইরে বেসরকারি খাতে যেতে চাইলেও দেখা যায় বেতন কম, কাজের পরিবেশ অনিশ্চিত এবং চাকরির নিরাপত্তা নেই। ফলে একটি বড় অংশ না পারছেন সরকারি চাকরি পেতে, না যেতে চাইছেন বেসরকারি খাতে।
দীর্ঘ বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, মানসিক সংকটও তৈরি করছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেকার তরুণদের মধ্যে হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং বিষণ্নতার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কেউ কেউ ঝুঁকছেন মাদকের দিকে, কেউ পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে— প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ পথে।
পথ কোথায়?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ সংকট থেকে বের হতে হলে দরকার বহুমুখী পদক্ষেপ। কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, উদ্যোক্তা তৈরিতে সহজ ঋণ সুবিধা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতে কাজের পরিবেশ উন্নত করা এখন সময়ের দাবি।
রাকিব হাসানরা শুধু চাকরি চান না— তারা চান একটা সম্মানজনক ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারলে একটি প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের দায় নিতে হবে রাষ্ট্রকেই।