কোরবানির বাজারে দাম বাড়াতে ‘ভাইরাল’ হতে হচ্ছে পশুকেও
সোশ্যাল মিডিয়ায় গরুর রিল-ভিডিও এখন নতুন বিপণন কৌশল
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০১:০৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
‘রয়্যাল’, ‘কালা পাহাড়’, ‘বাহুবলী’, ‘সুলতান’— শুধু নাম নয়, এবার কোরবানির হাটে গরুকেও হতে হচ্ছে ‘সেলিব্রিটি’। ফেসবুক রিল, ইউটিউব শর্টস আর টিকটকে গরুর ভিডিও ভাইরাল করে দাম হাঁকানোর নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে এবারের কোরবানির মৌসুমে। বিশাল দেহ, চকচকে গায়ের রং আর আকর্ষণীয় নামের সঙ্গে যোগ হয়েছে ভিডিও কনটেন্ট— এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে ‘প্রিমিয়াম’ গরুর বাজার।
হাটে ঢুকলেই চোখে পড়ে বড় সাইনবোর্ড— ‘বাহুবলী— ওজন ৩২ মণ’, ‘সুলতান— দাম ৮ লাখ’, ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড— একমাত্র দেখলেই কিনবেন’। খামারিরা বলছেন, গরুর একটি আকর্ষণীয় নাম রাখলে ক্রেতার মনে আগ্রহ তৈরি হয়, দাম নিয়ে দরকষাকষিও কমে।
ময়মনসিংহ থেকে আসা খামারি রফিকুল ইসলাম জানান, এ বছর তাঁর সবচেয়ে বড় ষাঁড়টির নাম রেখেছেন ‘টাইটান’। গত দুই সপ্তাহে ভিডিওটি ফেসবুকে প্রায় চার লাখ বার দেখা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনজন ক্রেতা অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছেন। ‘ভিডিও না দিলে এত মানুষ চিনতই না,’ বলেন তিনি।
শুধু ভিডিও তোলাই নয়, পেশাদার কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভাড়া করে গরুর ‘প্রোফাইল ভিডিও’ বানানোর চলও শুরু হয়েছে। ড্রোন শট, স্লো-মোশন ক্লিপ, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক— সব মিলিয়ে একটি গরুর প্রমোশনাল ভিডিও বানাতে খরচ হচ্ছে পাঁচ হাজার থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত।
ঢাকার একজন তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর সাকিব হাসান জানান, এ মৌসুমে তিনি ইতোমধ্যে ১৫টি গরুর ভিডিও বানিয়েছেন। ‘খামারিরা বুঝে গেছেন, ভালো ভিডিও মানেই ভালো দাম। এটা এখন একটা আলাদা ব্যবসা হয়ে উঠেছে।’
ক্রেতারাও বদলে গেছেন। আগে হাটে ঘুরে পছন্দ করতেন, এখন অনেকে আগেই অনলাইনে গরু 'শর্টলিস্ট' করে রাখেন, তারপর সরাসরি সেই গরুটি দেখতে আসেন।
রাজধানীর মিরপুর থেকে আসা ক্রেতা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ফেসবুকে একটা গরুর ভিডিও দেখে পছন্দ হয়েছিল। সরাসরি খামারে গিয়ে কিনে এসেছি, হাটেই যাইনি।’ তবে তিনি সতর্কও করেন— ‘ভিডিওতে অনেক সময় গরু বড় দেখায়, সরাসরি দেখলে হতাশ হওয়ার ঘটনাও আছে।’
ভাইরাল হওয়া গরু আর সাধারণ গরুর দামের ব্যবধান এখন আকাশ-পাতাল। সাধারণ মাঝারি গরু যেখানে ৬০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে ভাইরাল 'সেলিব্রিটি গরু'র দাম উঠছে পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে কোটি টাকা পর্যন্ত। রাঙামাটির হাটে ওঠা ‘রয়্যাল’ ও ‘কালা পাহাড়’ নামের দুটি গরুর দাম ইতোমধ্যে ছয় লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার এই ব্যবহার চামড়া ও গবাদিপশু খাতে একটি নতুন বিপণন সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে। তবে তাঁরা সতর্ক করছেন, ভিডিওতে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপনের জন্য অনেক সময় পশুকে অতিরিক্ত খাবার ও হরমোন দেওয়া হচ্ছে কিনা— সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
এই ট্রেন্ডের পেছনে রয়েছেন মূলত তরুণ প্রজন্মের খামারিরা, যাঁরা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঐতিহ্যবাহী পশুপালন ব্যবসাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছেন। তাঁদের কাছে গরু এখন শুধু পশু নয়— একটি ‘ব্র্যান্ড’।
কোরবানির হাটের এই বদলে যাওয়া চিত্র বলছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়া এখন পৌঁছে গেছে গোয়ালঘর পর্যন্ত।