EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

নারীদের শুয়ে সন্তান প্রসবের রীতি চালু হয়েছিল কবে?

ফিচার ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম

নারীদের শুয়ে সন্তান প্রসবের রীতি চালু হয়েছিল কবে?
অ অ

হাজার হাজার বছর ধরে নারীরা দাঁড়িয়ে, হাঁটু গেড়ে বা উবু হয়ে সন্তান প্রসব করে এসেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এসব ভঙ্গিতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সুবিধায় প্রসবপথ প্রশস্ত হয় এবং মা ও শিশুর ঝুঁকি কমে। তবে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত বিছানায় শুয়ে প্রসবের পদ্ধতিটি আসলে তুলনামূলক আধুনিক এবং এর পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত ইতিহাস।

কেউ কেউ এটিকে সন্তান প্রসবের ‘বিপজ্জনক’ পদ্ধতি বলেও বর্ণনা করে থাকেন। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রসবকালে চিত হয়ে শুয়ে থাকলে নারীদের সন্তান প্রসবের রাস্তা তুলনামূলক ধীরগতিতে প্রশস্ত হয়, যার ফলে প্রসববেদনা দীর্ঘায়িত হয়।

সেইসঙ্গে, গর্ভস্থ শিশুর শরীরে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহও ব্যাহত হতে পারে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনকার বেশিরভাগ নারীকে কেন বিছানায় পিঠ দিয়ে শুইয়ে রেখে সন্তান প্রসব করানো হয়? এই পদ্ধতিতে সন্তান প্রসবের প্রচলনই-বা ঘটেছিল কীভাবে?

এসব প্রশ্নের জবাব খুঁতে গিয়ে দেখা যায়, চিত হয়ে শুয়ে সন্তান প্রসব করানোর বর্তমান রীতির প্রচলন হয়েছিল একজন পুরুষ চিকিৎসকের হাত ধরে। তার নাম ফ্রাঁসোয়া মারিসো, যিনি সপ্তদশ শতকে রাজা চতুর্দশ লুইয়ের শাসনামলে ফ্রান্সে বসবাস করতেন বলে জানা যায়।

ডা. মারিসো দেখেছিলেন, চিত হয়ে শুয়ে থাকলে সন্তান প্রসব করানোটা তার জন্য বেশি সুবিধাজনক। পরে ধীরে ধীরে অন্য দেশগুলোতেও এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কিন্তু তুলনামূলক দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রসববেদনা সহ্য করতে হওয়ার পরও নারী কিংবা ধাত্রীরা কেন চিত হয়ে শুয়ে সন্তান প্রসবের রীতি অনুসরণ করে যাচ্ছেন?

জটিল ও ব্যয়বহুল পদ্ধতি

পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে সন্তান প্রসবের জন্য নারীকে হাসপাতালের বিছানায় চিত শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হয় বলে জানান জ্যানেট বালাস্কাস। তিনি বলেন, এটি একটি অযৌক্তিক প্রথা, যা সন্তান প্রসবের মতো একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অহেতুক জটিল এবং ব্যয়বহুল করে তোলে।

প্রচলিত এই পদ্ধতিতে প্রসূতি নারীকে ‘একজন নিষ্ক্রিয় রোগীতে’ পরিণত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর অন্য কোনো প্রজাতির প্রাণীকে সন্তান প্রসবের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন অসুবিধাজনক অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না।

গবেষকরা বলছেন, মানব সভ্যতার হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের মধ্যে মাত্র তিনশ থেকে চারশ বছরে আগে চিত হয়ে শুয়ে সন্তান প্রসব করার রীতি চালু হয়। এর প্রবর্তক ডা. ফ্রাঁসোয়া মারিসো দাবি করতেন, দাঁড়িয়ে বা বসে সন্তান প্রসবের তুলনায় শুয়ে সন্তান জন্ম দেওয়াটা নারীদের জন্য বেশি আরামদায়ক।

১৬৬৮ সালে প্রকাশিত তার 'দ্য ডিজিজেজ অব উইমেন উইথ চাইল্ড অ্যান্ড ইন চাইল্ড-বেড' গ্রন্থে ডা. মারিসো লিখেছেন, সন্তান প্রসবের সবচেয়ে ভালো ও নিশ্চিত উপায় হলো বিছানায় শুয়ে প্রসব করা। এক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানের পরে নারীদের নতুন করে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার ঝামেলা এড়ানো সম্ভব হয়।

তবে গবেষকদের কারো কারো মতে, চিত হয়ে শুয়ে সন্তান প্রসবের যে রীতির প্রবর্তন ডা. মারিসো ঘটিয়েছিলেন, সেটির পেছনে প্রভাব করেছিলেন ফ্রান্সের তৎকালীন শাসক রাজা চতুর্দশ লুই।

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের ম্যাকড্যানিয়েল কলেজের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক অধ্যাপক লরেন ডান্ডেস নারীদের সন্তান প্রসবের বিভিন্ন পদ্ধতির বিবর্তনের ওপর গবেষণা করেছেন।

১৯৮৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে তিনি লিখেছেন, কথিত আছে যে, রাজা চতুর্দশ লুই নারীদের (তার স্ত্রীদের) সন্তান প্রসবের দৃশ্য দেখতে পছন্দ করতেন। কিন্তু তখন বিশেষ চেয়ারে বসিয়ে সন্তান প্রসব করানো হতো, তাতে সন্তান প্রসবের দৃশ্যটি পরিষ্কারভাবে না দেখা যাওয়ায় রাজা হতাশ হতেন। সেজন্য তিনি হেলান দিয়ে সন্তান প্রসব করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।

তবে রাজা চতুর্দশ লুইয়ের এই উৎসাহ তখন সাধারণ মানুষকে ঠিক কতটা প্রভাবিত করেছিল, সেটি পরিষ্কার নয়।

‘রাজার নীতি কতটা প্রভাব রেখেছিল, সেটি পরিষ্কারভাবে জানা যায় না। তবে রাজপরিবারের যে কোনো সিদ্ধান্ত বা আচরণ সাধারণ প্রজাদের ওপর কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে থাকে।’

বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

হাজার হাজার বছর ধরে নারীরা যে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে সন্তান প্রসব করে আসছিলেন, সেটার মূল কারণ 'মাধ্যাকর্ষণ শক্তি'।

সন্তান জন্মদানের সময় নবজাতককে প্রসবনালীর মধ্য দিয়ে বের করতে হয়। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান জন্মের সময় নারীদের তাদের ইচ্ছামতো ভঙ্গি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং উবু হয়ে বসেন।

এক্ষেত্রে তারা হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া বা নিচু চেয়ার বা অন্য কোনো আসবাবপত্রে হেলান দেওয়ার মতো ভঙ্গিগুলো অবলম্বন করেন।

২০১৩ সালে পাঁচ হাজারেরও বেশি জন নারীর ওপর পরিচালিত ২৫টি গবেষণার একটি পর্যালোচনা বের হয়েছিল।

সেখানে বলা হয়েছে, যেসব নারী বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে থাকার পরিবর্তে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসার ভঙ্গিতে সন্তান প্রসব করেন, অন্যদের সঙ্গে তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

যেমন- তাদের মধ্যে সিজার করে সন্তান প্রসবের ঝুঁকি কমে যায়, ব্যথা উপশমের জন্য এপিডুরালের ব্যবহার, তথা ওষুধ খুব একটা লাগে না। এছাড়া তারা যেসব শিশুদের জন্ম দেয়, তাদেরও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

সেইসঙ্গে, সোজা হয়ে দাঁড়ালে তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে সন্তান জন্ম নেওয়ায় নারীদের প্রসবযন্ত্রণাও কম ভোগ করতে হয়।

তবে পর্যালোচনাটিতে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর’ নারীদের জন্য এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সন্তান প্রসব করলে অনেকসময় মায়ের রক্তক্ষরণ বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন