শ্রমিকের ঘামে গড়া পৃথিবী, তবু কেন অধিকারের লড়াই শেষ হয় না
মে দিবসের ১৩৮ বছর পরেও প্রাসঙ্গিক যে প্রশ্নগুলো
ছবি: সংগৃহীত
প্রতি বছর পহেলা মে আসে। লাল পতাকা ওড়ে। মিছিল হয়। স্লোগান ওঠে। তারপর দিনটি চলে যায়। কিন্তু শ্রমিকের জীবন কি সত্যিই বদলায়?
১৮৮৬ সালের পহেলা মে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিলেন হাজারো শ্রমিক। দাবি ছিল একটাই- দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের অধিকার। সেদিনের সেই রক্তাক্ত সংগ্রাম পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সেই আন্দোলনের স্মরণেই প্রতি বছর ১ মে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস। ১৩৮ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু শ্রমিকের লড়াই আজও শেষ হয়নি।
রক্তে লেখা যে ইতিহাস
সেদিনের শিকাগোর কথা মনে করলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। কারখানায় তখন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করা হতো শ্রমিকদের। মজুরি ছিল নামমাত্র। শিশুশ্রম ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। মানবেতর এই জীবন থেকে মুক্তির দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন লক্ষাধিক শ্রমিক। পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন অনেকে। ফাঁসিতে ঝুলেছিলেন শ্রমিকনেতারা। সেই আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের পৃথিবীতে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের স্বীকৃতি মিলেছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, শ্রমিকের জীবনে কি সত্যিকারের মুক্তি এসেছে?
বাংলাদেশের শ্রমিক: স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাক
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শ্রমিক। পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যাদের বেশিরভাগই নারী। তাদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি পোশাক বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডে শোভা পাচ্ছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ ভাগেরও বেশি আসে তাদের পরিশ্রমে। অথচ এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনো ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত। নিরাপদ কর্মপরিবেশ তাদের কাছে এখনো অনেকটাই বিলাসিতা।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের রানা প্লাজা ধসের কথা কি ভোলা যায়? সেদিন ১ হাজার ১৩৪ জন শ্রমিকের প্রাণ গিয়েছিল। আহত হয়েছিলেন আরও হাজার হাজার মানুষ। সেই ট্র্যাজেডি পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছিল। কিছু পরিবর্তনও এসেছে। কিন্তু যথেষ্ট কি?
অধিকারের কথা, বাস্তবের ছবি
আইনে আছে অনেক কিছু। শ্রম আইনে কাজের সময়সীমা নির্ধারিত আছে। মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান আছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে এসব অধিকার কতটুকু মেনে চলা হয়? অতিরিক্ত কাজের চাপ, ছুটি না পাওয়া, মজুরি বকেয়া রাখা- এই অভিযোগগুলো এখনো প্রতিদিনের সংবাদে উঠে আসে।
কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী- অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি শ্রমিক এখনো শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে। তাদের নেই কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, নেই ছুটি, নেই চিকিৎসার নিশ্চয়তা।
বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের সংকট
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই শ্রমিকের সংকট নতুন রূপ নিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকিতে ফেলছে। অটোমেশনের কারণে কলকারখানায় কমছে মানুষের প্রয়োজনীয়তা। গিগ ইকোনমিতে কাজ করা লাখো মানুষ নেই কোনো সামাজিক সুরক্ষার আওতায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিশ্রমিকরা পড়ছেন অস্তিত্বসংকটে।
তবু থামে না লড়াই
শত প্রতিকূলতার মাঝেও শ্রমিক থামেন না। প্রতিটি কারখানায়, প্রতিটি মাঠে, প্রতিটি নির্মাণস্থলে তারা প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করেন। ন্যায্য মজুরির দাবিতে, নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে, মানবিক মর্যাদার দাবিতে।
মে দিবস তাই শুধু একটি দিন নয়। এটি একটি অঙ্গীকারের নাম। সেই অঙ্গীকার- প্রতিটি শ্রমিকের ঘাম যেন বৃথা না যায়। প্রতিটি পরিশ্রম যেন ন্যায্য মূল্য পায়। প্রতিটি মানুষ যেন মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে।
শিকাগোর সেই শ্রমিকরা রক্ত দিয়ে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতা কমবে না। লাল পতাকা উড়তেই থাকবে।