EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

ক্যাম্পাস জীবন: শুরুটা রঙিন, শেষটা ধূসর

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই চার বছরের বিবর্তন কেবল একটি ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়; এটি একটি মানুষের আমূল বদলে যাওয়ার উপাখ্যান।

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১২ পিএম

ক্যাম্পাস জীবন: শুরুটা রঙিন, শেষটা ধূসর

ছবি: ছবি: আহমেদ বাপ্পী

অ অ

সেদিন ছিল সাধারণ কোনো রোদঝলমলে সকাল। কাঁধে নতুন ব্যাগ, চোখে একরাশ স্বপ্ন আর বুকভরা উত্তেজনা নিয়ে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে পা রেখেছিল এক তরুণ। অচেনা মুখগুলো তখন ছিল শুধুই সহপাঠী, আর বিশাল দালানগুলো ছিল গোলকধাঁধার মতো। অথচ আজ চার বছর পর, সেই একই ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পা দুটো যেন এগোতে চাইছে না। প্রতিটি ইটের কণা আজ চেনা, প্রতিটি মুখ আজ আত্মার আত্মীয়।

শুরু হয়েছিল একরাশ উত্তেজনা দিয়ে, আর শেষ হচ্ছে এক বুক বিষণ্নতায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই চার বছরের বিবর্তন কেবল একটি ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়; এটি একটি মানুষের আমূল বদলে যাওয়ার উপাখ্যান।

প্রথম বর্ষে একজন শিক্ষার্থীর কাছে ক্যাম্পাস মানেই হলো অবারিত স্বাধীনতা। স্কুলের ইউনিফর্ম আর কলেজের ধরাবাঁধা নিয়মের শিকল ভেঙে এখানে সবাই যেন মুক্ত বিহঙ্গ। নতুন বন্ধু বানানো, ক্যাফেটেরিয়ায় প্রথম আড্ডা, আর বড় ভাই-আপুদের ‘র‍্যাগ’ কিংবা ‘ওয়েলকাম’ অনুষ্ঠানের সেই অম্লমধুর অভিজ্ঞতা- সব মিলিয়ে প্রথম বছরটা কাটে ঘোরের মধ্যে।

প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, ‘প্রথম যখন ক্যাম্পাসে আসি, তখন মনে হতো পুরো পৃথিবীটা আমার হাতের মুঠোয়। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আড্ডা দেওয়া কিংবা লাইব্রেরির কোনায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করাটাই ছিল জীবনের পরম পাওয়া।’

দ্বিতীয় আর তৃতীয় বর্ষ আসতে আসতে সেই রঙিন ঘোর কাটতে শুরু করে। ইনকোর্স পরীক্ষা, ল্যাব রিপোর্ট, প্রেজেন্টেশন আর সিজিপিএ-এর ইঁদুর দৌড়ে জীবনটা অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। বন্ধুদের সাথে আড্ডার বিষয়গুলো সিনেমা বা ক্রিকেট থেকে বদলে গিয়ে স্থান করে নেয় বিসিএস, ক্যারিয়ার কিংবা স্কলারশিপের দুশ্চিন্তা। এই সময়েই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্বগুলো, যারা মধ্যরাতে চায়ের কাপে কিংবা পরীক্ষার আগের রাতে নোট শেয়ার করে পাশে থাকে।

শেষ বর্ষে এসে ক্যাম্পাসের সেই চিরচেনা রূপটা হঠাৎ করেই বদলে যেতে থাকে। যে ক্যাম্পাসকে একসময় জেলখানা মনে হতো, এখন সেখানেই প্রতিটি মুহূর্ত ধরে রাখতে ইচ্ছে করে। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় মনে পড়ে- এখানেই হয়ত প্রথম কারো প্রেমে পড়া হয়েছিল, কিংবা ওই গাছতলায় বসে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া মিটিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

বিদায়ের ঘণ্টা যত ঘনিয়ে আসে, বিষণ্নতা ততটা জেঁকে বসে। শেষ ক্লাসের পর যখন সবাই মিলে শেষবারের মতো গ্রুপ ছবি তোলে, তখন অনেকের চোখের কোণেই চিকচিক করে জল। কারণ সবাই জানে, এরপর আর চাইলেই প্রতিদিন দশটার ক্লাসে সবার দেখা হবে না। সবার গন্তব্য আলাদা হয়ে যাবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবন একজন কিশোরকে পূর্ণাঙ্গ মানুষে রূপান্তরিত করে। প্রথম বর্ষের যে উত্তেজনা, তা হলো অজানাকে জানার কৌতূহল। আর শেষ বর্ষের বিষণ্নতা হলো প্রিয় কিছু হারানোর ভয়। এই চার বছরে একজন শিক্ষার্থী প্রতিকূলতার সাথে লড়তে শেখে, যা তার ভবিষ্যৎ জীবনের সবচেয়ে বড় পুঁজি।’

শেষ বর্ষের ছাত্রী আনিকা অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় মনে হচ্ছে জীবনের একটা বড় অংশ এখানে ফেলে যাচ্ছি। প্রথম দিন যখন এসেছিলাম, তখন পরিচিত কেউ ছিল না। আর আজ যাওয়ার সময় মনে হচ্ছে, এই ক্যাম্পাসটাই আমার ঘর হয়ে গিয়েছিল।’

বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামে, ক্যাম্পাসের ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে ওঠে, তখন সেই চেনা আড্ডার জায়গাগুলোতে হয়ত নতুন কোনো প্রথম বর্ষের ব্যাচ আড্ডা জমাচ্ছে। সময় বহমান, ব্যাচ পাল্টায়, মুখ পাল্টায়- কিন্তু প্রথম বর্ষের সেই রঙিন উত্তেজনা আর শেষ বর্ষের নীল বিষণ্নতার গল্পটা প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে একই থেকে যায়।

আরও পড়ুন