জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ডিসেম্বর এলেও ক্যাম্পাসে নেই পাখিদের কলরব
অতিথি পাখির অভয়ারণ্য এখন সংকটে!
কচুরিপানা আর প্লাস্টিকের বোতলের ভাগাড়ে অতিথি পাখিদের আশ্রয়। ছবি: অরিত্র সাত্তার
হেমন্তের পরে আসে শীত। আর তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে নতুন অতিথি। শীতপ্রধান বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসে অতিথি পাখিরা। নিরাপদ বাসস্থানের খোঁজে আসা এই পাখিদের কলতানে মুখরিত হয় ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের সঙ্গে পাখিদের কোলাহলমুখর প্রকৃতির এ মুগ্ধ রূপ পর্যবেক্ষণ করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে আসে নিসর্গপ্রেমী মানুষের দল।
তবে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির। বিভিন্ন কারণে জাবিতে উদ্বেগজনকভাবে কমছে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা। এর কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত নগরায়ন, সময়মতো লেক সংস্কার না করা, কনসার্ট ও আতশবাজির শব্দ, গাছ কাটা, লেক লিজ দেওয়া, বহিরাগতদের উৎপাতসহ নানা অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন পাখি গবেষকরা।
প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে শীত এলেই মুখরিত হয়ে উঠত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন। মঙ্গোলিয়া, সাইবেরিয়া, নেপালসহ শীতপ্রধান অঞ্চলের হাজার হাজার অতিথি পাখির কলকাকলিতে ক্যাম্পাস পরিণত হতো এক জীবন্ত চিত্রে।
-69372da1c47bc.jpg)
অথচ, এবার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। নভেম্বরের শুরু থেকে যে পাখিদের আগমন প্রত্যাশিত ছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত ভিড় ডিসেম্বরও এবার চোখে পড়ছে না। অতিথি পাখির এই অনুপস্থিতি কেবল শিক্ষার্থীদের হতাশ করছে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য এবং জীববৈচিত্র্যকেও ফেলেছে এক গভীর সংকটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথম পরিযায়ী বা অতিথি পাখি আসে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২০৬ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলোতে দেখা গেছে। এগুলোর ১২৬টি দেশি প্রজাতির। বাকিগুলো বিদেশি প্রজাতির। যেসব পরিযায়ী পাখি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, বেশির ভাগই হাঁস-জাতীয়। এর মধ্যে সরালি, পচার্ড, ফ্লাই ফেচার গার্গেনি, ছোট জিরিয়া, পান্তামুখী, পাতারি, কোম্বডাক, পাতারি হাঁস ও কাম পাখি অন্যতম। এ ছাড়া কলাই, মানিকজোড়, কলাই, ছোটনগ, জলপিপি প্রভৃতি পাখিরও দেখা মেলে।
গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণ, সময়মতো জলাশয় পরিষ্কার না করা, প্রচুর পরিমাণে জনসমাগম, জলাশয়ের পাড়ে মানুষের বিশৃঙ্খলা, পানিদূষণসহ নানা কারণে পাখি আসার হার কমে গেছে। বছর পাঁচেক আগেও ক্যাম্পাসের পরিবহন চত্বর-সংলগ্ন জলাশয়, আল বেরুনি হল-সংলগ্ন জলাশয়, পুরোনো প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন জলাশয়, জিমনেসিয়াম-সংলগ্ন জলাশয়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হল-সংলগ্ন জলাশয়সহ বিভিন্ন জলাশয়ে শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটত। তবে বর্তমানে ক্যাম্পাসে সংরক্ষিত জলাশয় ওয়াল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার বাদে বাকি কোনো জলাশয়ে পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে না।
তবে, গত কয়েক বছর ধরে এই চিত্রে পরিবর্তন আসছিল, যা এ বছর আরও প্রকট। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের বক্তব্যে তা যেন স্পষ্ট। তিনি জানান, ‘আমরা শুনেছি জাবি অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্য। কিন্তু ক্যাম্পাসে এসে দেখছি উল্টো চিত্র। আগের মতো পাখি নেই। মনে হচ্ছে জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।’

অনেকে মনে করছেন, শীতের তীব্রতা বাড়লে হয়তো জানুয়ারির দিকে পাখির সংখ্যা বাড়তে পারে, কিন্তু পরিবেশবিদদের মতে, নভেম্বরের শুরুতে পাখিদের আগমনের ধারাবাহিকতা ভেঙে বর্তমানের এই বিলম্ব বা অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে এক অশনি সংকেত।
অতিথি পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা ও প্রশাসন।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান এই সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে জলাশয়গুলোর পরিবেশকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের যেসব জলাশয়ে পাখিরা থাকে, সেগুলো এখন তাদের বসবাস-উপযোগী নয়। জলাশয়ের আশপাশে অধিক লোকসমাগম ও শব্দদূষণই এর প্রধান কারণ।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম পাখি কমে যাওয়ার জন্য একাধিক কারণ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ, যা পাখিদের বিচরণে সমস্যার সৃষ্টি করে, তা একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। এছাড়াও রয়েছে অতিরিক্ত যানবাহন থেকে সৃষ্ট কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ এবং পাখির খাদ্য সংকট।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনে করেন, উচ্চ স্তরের সদিচ্ছার অভাবের কারণেই দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, গাছ কাটা, লেক ভরাট ও পরিষ্কার না করাসহ বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করলেই কেবল অতিথি পাখির আগমন পুনরায় বাড়ানো সম্ভব।
প্রতি বছর অতিথি পাখি আসার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন লেকগুলো পরিষ্কার করা এবং নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিতে সচেতনতামূলক ব্যানার টানানোর মতো উদ্যোগ নিলেও, বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে কেবল মৌসুমি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

রিকশা চালক রফিক মিয়া বলেন, আমি প্রায় দশ বছর ধইরা এই ক্যাম্পাসে রিকশা চালাই। নিজের চোখেই দেখছি কত কী হইলো, কত কী বদলাইলো। কিন্তু যেই জিনিসটা সবথেকে বেশি চোখে পড়ে, সেটা হইলো পাখি। একসময় শীতকালে এমন কোনো লেক ছিল না, যেইখানে পাখি নাই। ভোরে রিকশা লইয়া বাইর হইলে শুধু পাখির কিচিরমিচির আর ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যাইতো। দূর থেইকা মানুষ আসতো খালি পাখি দেখতে। আমরাও রিকশা চালাইয়া ভালো কামাইতাম। পাখির ভিড়ে ক্যাম্পাসে একটা আলাদা খুশি আর উৎসবের ভাব থাকতো।
জাবি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই মনোমুগ্ধকর ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এবং দেশের আবহমান জীববৈচিত্র্যের এই অপরূপ সৌন্দর্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে এখন জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
জলাশয়গুলোর সংস্কার, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, ক্যাম্পাসের আশপাশের অননুমোদিত নির্মাণ কাজ বন্ধ এবং পাখিদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই হয়তো জাবির লেকগুলো আবার অতিথি পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠবে। অন্যথায়, এই অভয়ারণ্য তার ঐতিহ্য ও গৌরব চিরতরে হারাতে পারে।