‘নবাব’খ্যাত আনোয়ার হোসেনকে মনে রাখেনি কেউ
পাঁচ দশক অভিনয় করা ‘নবাব’খ্যাত আনোয়ার হোসেন ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৮২ বছর বয়সে মারা যান।
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২২ পিএম
‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্যে অভিনেতা আনোয়ার হোসেন।
দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে ছবির পর ছবিতে কাজ করেছেন অভিনেতা আনোয়ার হোসেন। ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ সেপ্টেম্বর ৮২ বছর বয়সে মারা যান ঢাকার চলচ্চিত্রের ‘নবাব’খ্যাত এই অভিনেতা।
১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুর জেলার মুরুলিয়া গ্রামের মিয়াবাড়িতে জন্ম আনোয়ার হোসেনের। তাঁর বাবা এ কে এম নাজির হোসেন ছিলেন জেলা সাব-রেজিস্ট্রার। ১৯৪০ সালে দেওয়ানগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন তিনি এবং স্কুলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫১ সালে জামালপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ময়মনসিংহ কলেজে ভর্তি হন।
কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে অভিনয় করার পর থেকেই নাটকের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে বাবার বন্ধু আবদুল্লাহ খানের ‘সেলকন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ফার্মে সুপারভাইজারের চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৯ সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ননী দাসের পরিচালনায় ‘এক টুকরো জমি’ নাটকে অভিনয় করেন। এরপর ঢাকা বেতারে অডিশন দিয়ে নির্বাচিত হয়ে ‘হাতেম তাই’ নাটকে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। মঞ্চনাটকে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় আব্দুল জব্বার খান, মোহাম্মদ আনিস ও হাবিবুর রহমানের সঙ্গে।
ঝিনুক পত্রিকার সম্পাদক আসিরুদ্দিনের সহযোগিতায় তিনি গড়ে তোলেন মিনার্ভা থিয়েটার। এই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন সৈয়দ হাসান ইমাম, ফতেহ লোহানী, মেহফুজ, সুভাষ দত্ত ও চিত্রা সিনহাসহ অনেকে।
১৯৬১ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ ছবিতে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করেন আনোয়ার হোসেন। এরপর সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ ছবিতে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত মোট ১৮টি ছবিতে কাজ করেন। ১৯৬৭ সালে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে নবাবের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি পান ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি। সিরাজের দেশপ্রেমের যন্ত্রণা দর্শকদের মনে জাগিয়ে তুলতে পারায় ছবিটি ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
আনোয়ার হোসেন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যনির্ভর, শিশুতোষ, লোককাহিনিভিত্তিক, পোশাকি ফ্যান্টাসি, সামাজিক ও পারিবারিক মেলোড্রামাসহ সব ধরনের ছবিতে অভিনয় করেছেন। সালাহউদ্দিন, খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, আমজাদ হোসেন, ইবনে মিজান, আলমগীর কবির, জহির রায়হান, নারায়ণ ঘোষ মিতা, সুভাষ দত্ত, নজরুল ইসলাম, আজিজুর রহমান, এ জে মিন্টু, চাষী নজরুল ইসলামসহ অনেক নামী পরিচালকের ছবিতে কাজ করেছেন তিনি।
‘সূর্যস্নান’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘জয় বাংলা’, ‘অরুণোদ্বয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘লাঠিয়াল’, ‘পালঙ্ক’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘নাজমা’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘সূর্যসংগ্রাম’, ‘দায়ী কে’ ও ‘সত্য মিথ্যার’ মতো ছবির অভিনেতা হিসেবে যুগের পর যুগ দর্শকদের হৃদয়ে থেকে যাবেন আনোয়ার হোসেন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে আনোয়ার হোসেন প্রায় ৩৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন নিগার পুরস্কার। ১৯৮৫ সালে তিনি একুশে পদক পান এবং দুবার বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।