সালমান শাহ হত্যা মামলা: ৩০ বছর পরও খোলেনি যে রহস্যের জট
আসাদুল ইসলাম, ঢাকা
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৪ এএম
জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা সালমান শাহ। ছবি: সংগৃহীত
জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, ওরফে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য তিন দশকেও কাটেনি। ১৯৯৬ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময়ে একাধিক তদন্ত, বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়া হলেও জনপ্রিয় এই অভিনেতা আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল—প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত।
সালমানের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী একটি অপমৃত্যু মামলা করেন। এরপর একাধিক তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও শুরু থেকেই এটিকে হত্যা দাবি করে আসছে তাঁর পরিবার। সবশেষ গত বছর আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে এফআইআরভুক্ত হওয়ার পর তদন্ত নতুন দিকে মোড় নেয়। তবে নয় দফা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। আদালতের নির্দেশেই মামলাটি করা হয়। মামলায় সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, তাঁর মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, এ ছত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদকে আসামি করা হয়।
মামলায় সম্প্রতি আসামি অভিনেতা ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৯ আগস্ট গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং রিমান্ডেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিন দশক পর এই মামলায় প্রথম কোনো আসামি গ্রেপ্তার হলেন।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, “আমি শুরু থেকেই বলে এসেছি, এটা হত্যা। আমার ছেলে মারা যায়নি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর আমার ছেলের মৃত্যুদিবস নয়, এটা সালমান শাহর হত্যাদিবস। সে মরে কীভাবে?
ডন গ্রেপ্তার হয়েছে। সামিরাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক কিছু বের হয়ে যাবে। সামিরা, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, রুবি—এদের গ্রেপ্তার করলে সব বের হয়ে আসবে। আমি চাই, বর্তমান সরকার যেন জাতির কথা চিন্তা করে এবং এই ঘটনার বিচার নিশ্চিত করে।”
তিনি আরও বলেন, “সালমানের মৃত্যুর পর তারা বহুদিন আমাদের হয়রানি করেছে। কাজের বুয়াকে দিয়ে ভুয়া মামলা দেওয়াইছে, শাহরানের গাড়িতে হামলা করেছে। সারাক্ষণ তারা আমাদের ওয়াচ করে রাখত। ৬ সেপ্টেম্বরের আগে ও পরে যেসব ঘটনা আমাদের সঙ্গে ঘটেছে, তা-ই প্রমাণ করে, এটা একটি হত্যা।”
এ সময় হত্যার পেছনে কারণ হিসেবে সামিরার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ও সালমানকে বয়কটের ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান বলেন, ‘৩০ বছর ধরে আমি বিচারের অপেক্ষায় আছি। সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আমরা তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
মামলাটি এখন তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। আশা করছি, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করার চেষ্টা করব।’
অপমৃত্যু মামলা থেকে হত্যা মামলা
১৯৯৬ সালে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় রমনা থানায় প্রথমে একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়। পরের বছর ২৪ জুলাই তাঁর বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী আদালতে আবেদন করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ ছিল, তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ইস্কাটনের বাসায় সালমানকে অচেতন অবস্থায় পাওয়ার পর প্রথমে তাঁকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সালমানের বাবা দাবি করেন, তাঁর ছেলের গলায় ফাঁসের দাগ ছিল এবং মুখ ও পা নীল হয়ে গিয়েছিল।
তবে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। ২৫ নভেম্বর আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। এর বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন সালমানের বাবা।
২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। ২০১৪ সালে দেওয়া ওই তদন্ত প্রতিবেদনেও সালমানের মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে আবারও নারাজি আবেদন করে।
পরে তদন্তভার যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত ব্যুরো—পিবিআইয়ের কাছে। ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআইও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, সালমান আত্মহত্যা করেছেন।
আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে ইউডি মামলাটি নিষ্পত্তি করেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে সেই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে এফআইআর করার নির্দেশ দেন।
রিজভীর জবানবন্দিতে হত্যার বর্ণনা
রিভিশন মামলার নিষ্পত্তির আদেশে সালমান শাহর মৃত্যুর বিভিন্ন দিক নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এতে রিজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি, মৃত্যুর সময়কার পরিস্থিতি, ‘লাস্ট সীন’ তত্ত্ব এবং সালমানের স্ত্রী সামিরার স্যুটকেস থেকে লিগনোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে গ্রেপ্তারের পর রিজভী আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। সেখানে সালমানকে হত্যার পরিকল্পনা এবং ঘটনার রাতের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, সালমানকে হত্যার জন্য ১২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল—৬ লাখ টাকা হত্যার আগে এবং বাকি ৬ লাখ পরে। তিনি দাবি করেন, প্রথমে ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়; পরে আরও ৪ লাখ টাকা আনা হয়।
তিনি আরও বলেন, ডন একটি প্লাস্টিকের রশি কেটে দুই টুকরা করেন। এক টুকরা নিজের কাছে রাখেন এবং অন্যটি দেন ফারুককে।
রিজভীর জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন রাতে ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক ও রিজভী সালমানের ইস্কাটনের বাসায় যান। সেখানে সালমানের স্ত্রী সামিরা ও তাঁর মা আগে থেকেই ছিলেন। পরে আজিজ মোহাম্মদ ভাইও সেখানে আসেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।
রিজভীর দাবি, শোবার ঘরে ঘুমন্ত সালমানের ওপর হামলা করে তাঁকে ড্রেসিংরুমে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর পা বেঁধে রাখা হয়।
এরপর আজিজ সালমানকে ইনজেকশন দেওয়ার কথা বলেন বলে দাবি করেন রিজভী। ফারুক সিরিঞ্জ এনে দেন। সামিরা তাতে সালমানকে ইনজেকশন দেন এবং তাঁর মা সহযোগিতা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। ইনজেকশনের পর সালমান নিস্তেজ হয়ে পড়েন বলে দাবি করেন রিজভী।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে দেওয়া আদেশে আদালত বলেন, মৃত্যুর আগে সালমানের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, বিশেষ করে তাঁর বাসায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে হবে।
এতে আরও বলা হয়, দ্বিতীয় মেডিকেল বোর্ড মৃত্যুর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণে উপনীত হতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে ভিকটিমের মৃত্যুর বিষয়টি পুরোপুরি পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করবে। কোনো মেডিকেল পরীক্ষার রিপোর্টই কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে চূড়ান্ত নয়। তা সাক্ষ্যের আলোকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সালমানকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামানোর পর পুলিশ বা কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে কেন ডাকা হয়নি—তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এ ছাড়া হাসপাতালে নেওয়ার আগে ঘটনাস্থলে কোনো পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সালমানের স্ত্রী সামিরার একটি স্যুটকেস থেকে লিগনোকেইন হাইড্রোক্লোরাইডের একটি কাচের শিশি পাওয়ার বিষয়টিও আদালতের নথিতে এসেছে। রাসায়নিক পরীক্ষায় ওই পদার্থ শনাক্ত হয়েছিল। তবে শিশিটি সেখানে কেন ছিল, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পূর্বের নথিতে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালত আরও বলেন, সালমান আত্মহত্যা করার কোনো কারণ থাকলেও মৃত্যুর সময় যাঁরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের কোনো দায় ছিল কি না, তা নির্ধারণে কোনো মামলা বা তদন্ত হয়নি। আদালত উল্লেখ করেন, এমন অপরাধ দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আমলযোগ্য।