EN ☀️
×

Follow Us

শিক্ষা

যেসব কারণে গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম

যেসব কারণে গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধ নানা কারণে প্রত্যাহার করা হয়। শুধু চৌর্যবৃত্তিই নয়, তথ্য জালিয়াতি, গবেষণাগত ত্রুটি, নীতিমালা লঙ্ঘনসহ অন্তত আটটি প্রধান কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই গবেষক নিজেরাও ভুল শনাক্ত হলে নিবন্ধ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহারের প্রধান আটটি কারণ হলো—তথ্য জালিয়াতি বা বিকৃতি, চৌর্যবৃত্তি, গুরুতর গবেষণাগত বা পদ্ধতিগত ত্রুটি, একই নিবন্ধ একাধিকবার প্রকাশ, ভুয়া বা ফরমায়েশি বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন (পিয়ার রিভিউ), লেখকত্বসংক্রান্ত অনিয়ম, গবেষণা নীতিমালা লঙ্ঘন এবং স্বার্থের সংঘাত গোপন করা।

শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে অবস্থান উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার মান নির্ধারণে জার্নালের গ্রহণযোগ্যতা, পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সমাজে তার স্বীকৃতি বিবেচনা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, কোনো জার্নাল নিবন্ধ প্রত্যাহারের আগে সাধারণত লেখকদের অভিযোগ সম্পর্কে জানায় এবং তাঁদের মতামত চায়। জবাব সন্তোষজনক না হলে নিবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়।

সূত্র জানায়, গবেষকরা সাধারণত স্কোপাস বা ওয়েব অব সায়েন্সে অন্তর্ভুক্ত জার্নালে গবেষণা প্রকাশে আগ্রহী হন। এসব জার্নাল গবেষণার মূল্যায়নে বেশি গুরুত্ব পায়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালের ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে চীনের ১৪ হাজার ৩৮১টি, ভারতের ২ হাজার ৩২৫টি, যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৪২৪টি, সৌদি আরবের ১ হাজার ১৭৪টি, পাকিস্তানের ৬২৬টি, ইরানের ৫৬০টি, মিসরের ৫১৮টি, যুক্তরাজ্যের ৩৯৪টি, মালয়েশিয়ার ২৮২টি, কানাডার ২০৭টি এবং বাংলাদেশের ১২৫টি গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

শিক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের গবেষণার সংখ্যা এখনও তুলনামূলক কম। এর অন্যতম কারণ সীমিত গবেষণা বাজেট। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু সরকারি বরাদ্দ থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব অর্থায়নে গবেষণা পরিচালনা করতে হয়। সীমিত অনুদান, আধুনিক গবেষণাগারের অভাব এবং অতিরিক্ত পাঠদানের দায়িত্বের মধ্যেও গবেষকেরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

জানা যায়, একটি মানসম্মত জার্নালে প্রকাশের আগে নিবন্ধ সাধারণত তিন থেকে চারজন বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা করেন। তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী সংশোধনের পর নিবন্ধ গ্রহণ করা হয়। অধিকাংশ জার্নালে গোপন পিয়ার রিভিউ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তাই ভুয়া পিয়ার রিভিউয়ের দায় মূলত জার্নাল কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

ড. আবুল কাশেম মিয়া বলেন, আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা নিবন্ধ শুধু চৌর্যবৃত্তির কারণে প্রত্যাহার হয়—এ ধারণা সঠিক নয়। তাঁর ভাষায়, অন্তত আট থেকে ১০টি কারণে নিবন্ধ প্রত্যাহার হতে পারে এবং টেকনিক্যাল কারণেই বেশি প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় গবেষক নিজেই নিবন্ধ প্রত্যাহার করেন, আবার তথ্য বা সাইটেশনে ত্রুটি থাকলেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কয়েকটি নিবন্ধ প্রত্যাহারের ঘটনায় পুরো শিক্ষকসমাজকে দায়ী করা ঠিক নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক আন্তর্জাতিক জার্নাল প্রতি নিবন্ধের জন্য দেড় লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত প্রক্রিয়াকরণ ফি নেয়। নিম্নমানের নিবন্ধ গ্রহণ ও দুর্বল পর্যালোচনা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় কিছু জার্নাল নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা দেখাতে প্রকাশিত নিবন্ধও পরে প্রত্যাহার করে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ১৭১টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৩টির শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে ১৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় ছিল দুই কোটি টাকার নিচে। গবেষণায় কম বিনিয়োগের কারণে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং, উদ্ভাবন, পেটেন্ট ও জ্ঞান উৎপাদনে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

ড. ফরিদ আহমদ সোবহানী বলেন, নানা কারণেই গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়, যার মধ্যে চৌর্যবৃত্তি মাত্র একটি কারণ। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে গবেষণার গুরুত্ব বাড়ার পাশাপাশি অনেক জার্নালে প্রকাশ ফি দুই থেকে চার লাখ টাকা হওয়ায় এ খাত ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে। ফলে গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশের পাশাপাশি প্রত্যাহারের ঘটনাও বাড়ছে।

এদিকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। কমিশনের আশা, অভিন্ন নীতিমালা গবেষণার নৈতিক মান বজায় রাখতে সহায়ক হবে।

আরও পড়ুন