ব্যয় ও জ্বালানি সংকটে চাপে অর্থনীতি, কমল পিএমআই
উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতে দুর্বলতা; কৃষিতে সম্প্রসারণ অব্যাহত
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের চাপে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আবারও সংকোচন দেখা দিয়েছে। সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) আগের মাসের তুলনায় ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৪৮ দশমিক ৬-এ নেমেছে। উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে সংকোচন এবং সেবা খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক সূচকের নিম্নমুখী হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে কৃষি খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকা এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) যৌথভাবে বুধবার (৭ অক্টোবর) সেপ্টেম্বর মাসের পিএমআই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তা এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের (এসআইপিএমএম) কারিগরি সহযোগিতায় সূচকটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে কৃষি খাতের পিএমআই ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৫৫ দশমিক ২-এ দাঁড়িয়েছে। সূচক কমলেও এ খাতে টানা ১৩ মাস ধরে সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। তবে নতুন ব্যবসা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণের গতি কমেছে। উপকরণের ব্যয় বাড়তে থাকলেও বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে, বকেয়া অর্ডার সংকুচিত হলেও সেই সংকোচনের গতি আগের মাসের তুলনায় কমেছে।
উৎপাদন খাতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এ খাতের পিএমআই ২ দশমিক ৬ পয়েন্ট কমে ৪৪ দশমিক ৮-এ নেমেছে। নতুন অর্ডার, রপ্তানির নতুন অর্ডার, উৎপাদন, কাঁচামালের মজুত, সমাপ্ত পণ্যের মজুত ও আমদানি—সব সূচকেই সংকোচনের গতি বেড়েছে। তবে কর্মসংস্থান আবার সামান্য সম্প্রসারণে ফিরেছে। এদিকে উৎপাদনের উপকরণের দাম বাড়তে থাকায় ব্যয়চাপ অব্যাহত রয়েছে। বকেয়া অর্ডারে উল্লেখযোগ্য সংকোচন দেখা গেছে। সরবরাহকারীদের পণ্য সরবরাহের সময় বৃদ্ধির হার অবশ্য কিছুটা কমেছে।
নির্মাণ খাতেও আগস্টের সম্প্রসারণের ধারা সেপ্টেম্বরে থেমে গেছে। এ খাতের পিএমআই ৩ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে ৪৮ দশমিক ৫-এ নেমেছে। নতুন ব্যবসা ও নির্মাণ কার্যক্রমে সংকোচন দেখা দিলেও কর্মসংস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। উপকরণের ব্যয় শক্তিশালীভাবে বাড়তে থাকলেও বৃদ্ধির হার সামান্য কমেছে। তবে বকেয়া অর্ডার আবার সম্প্রসারণে ফিরেছে।
সেবা খাতে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো প্রান্তিক সংকোচন অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরে এ খাতের পিএমআই ০ দশমিক ২ পয়েন্ট কমে ৪৯-এ দাঁড়িয়েছে। নতুন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম আবার সংকুচিত হয়েছে। কর্মসংস্থানে সংকোচনের গতি কিছুটা কমলেও উপকরণের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বকেয়া অর্ডারের সংকোচনও অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশায় সতর্কতার চিত্র উঠে এসেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত অর্ডার, নির্ভরযোগ্য ক্রেতা এবং শীতকাল ও আসন্ন ব্যবসার মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থেকে আগামী মাসগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম উন্নতির আশা করছে।
তবে অনেক ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, ভোক্তাদের দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণ পেতে সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আগাম পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, অর্থায়নের সহজলভ্যতা এবং ব্যয়চাপ কমানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিস্থিতি সূচক (ফিউচার বিজনেস ইনডেক্স) চারটি খাতেই সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে আগামী মাসগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সতর্ক আশাবাদের প্রতিফলন দেখা গেছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, সেপ্টেম্বরে উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের দুর্বলতার কারণে দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে কৃষি খাতের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করছে।
তিনি বলেন, সব খাতেই ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে কিছুটা ইতিবাচক প্রত্যাশা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি করছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি ফিরিয়ে আনতে অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা জোরদার করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কমানো এবং ব্যয় বৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।